সাক্ষাত্কার সুবোধ সরকার

| |

‘কবিতা আমায় অনেক দিয়েছে। নিয়েওছে অনেক কিছু। তবুও দেওয়ার পরিমাণ বেশি বলে সেটুকুই মনে রাখতে চাই।’
বাংলা কবিতা থেকে বিশ্বকবিতা। ব্যক্তিজীবন থেকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান। এই সবকিছু নিয়েই কবি সুবোধ সরকারের মুখোমুখি পায়েল সেনগুপ্ত।

পায়েল: ‘ঋক্ষ মেষ কথা’ থেকে ‘দ্বৈপায়ন হ্রদের ধারে’...শুধু কবিতা নয়, এ তো জীবনেরও এক দীর্ঘ যাত্রাপথ। ওই পথের বাঁকগুলো কীভাবে পেরিয়েছেন জানতে ইচ্ছে করে...
সুবোধ: ‘ঋক্ষ মেষ কথা’ আমার প্রথম কবিতার বই, সেটাই সকলে জানে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, তার আগে একটা ছোট বই বেরিয়েছিল, কবিতা ৭০-৮০। ওই বইটা কেন লোকে ধরে না, বলতে পারব না। সকলে ‘ঋক্ষ মেষ কথা’ থেকেই শুরু করে। আনন্দ পাবলিশার্স থেকে যে-কবিতাসমগ্র বেরিয়েছে, তাতে কবিতাগুলো পাওয়া যাবে। যাই হোক, এই ‘দীর্ঘ পথ’ বলতে প্রায় ৩৫ বছর। বইটার ব্যাপারে একটা মজার গল্প ছিল। আমার বাবা মারা যান খুব অল্প বয়সে, আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। কৃষ্ণনগর মাতৃসদন নামক একটি সরকারি হাসপাতালে আমার জন্ম। বাবা পালিয়ে এসেছিলেন ওপার বাংলা থেকে, মায়ের হাত ধরে। আমি একটা কবিতা লিখেছিলাম যে, আমি জন্মানোর আগে থেকেই দৌড়চ্ছি। যদিও সেই সময় আমি মায়ের গর্ভে ছিলাম না, তবুও এমন একটা অনুভূতি হয়েছিল...মা দৌড়চ্ছে, সঙ্গে বাবা আর বর্ডারে সিকিয়োরিটি ফোর্সের লোকরা ধরেছে। বলছে, “কোথায় যাবে?” মা তখন বলছেন, “তোমরা কি এখানে তুলসীগাছ লাগাতে দাও? ওরা আমাকে ওপারে তুলসীগাছ লাগাতে দেয়নি! ” এই কথাটা মা বলতেন। আমায় খুব হন্ট করত কথাটা। মাতৃসদন একটা খুব ভয়ঙ্কর সরকারি হাসপাতাল। আমি আরও একটা কবিতা লিখেছিলাম আমার জন্মের রাত নিয়ে। মাতৃসদনে প্রচুর কুকুর ছিল এবং প্রত্যেক প্রসূতির বিছানার নিচে একটা করে কুকুর শুয়ে থাকত। শুনেছি, আমার ঠ্যাং ধরেও নিয়ে যাচ্ছিল একটা। সঙ্গে-সঙ্গে আর-একটা কুকুর, তার প্রতিদ্বন্দ্বী, সে তার সামনে এসে দাঁড়ায় এবং চিত্‌কার শুরু করে। এই চিত্‌কারেই আগের কুকুরটা আমায় রেখে পালিয়ে যায়। এটা আমার কাছে একটা মেটাফর। কতটা সত্যি, আমি বলতে পারব না। মা যত না বলতেন, আশপাশের লোকজন আরও বেশি করে বলতেন। কবিতা লেখার ক্ষেত্রে এই গল্পগুলো খুব কাজ করেছিল। তার উপর নকশাল আন্দোলনের অভিজ্ঞতাও ছিল। তারপর বাবা মারা গিয়েছেন। সত্যিই আমার সেকেন্ড মিল ওয়জ় আনসার্টেন। একবেলা খেলে অন্যবেলা কী খাব, সেটা জানতাম না। ছেলেকে বললে ভাবে, বাবা বোধ হয় বানিয়ে গল্প বলছে।
প্র: কিন্তু এগুলো তো সত্যি ঘটনা...
উ: ভীষণরকম সত্যি। এই যে তিন-চারটে ঘটনা আমার জীবনে, তা কিন্তু আগামী পঁয়ত্রিশ বছর আমার জীবনের লেখালেখির একটা রসদ তৈরি করে দেয়, বেসমেন্ট হিসেবে কাজ করে। সে যাই হোক, কবিতা তৈরি হল, কিন্তু ছাপবে কে? কিছু-কিছু লিট্ল ম্যাগাজ়িনে ছাপা হল। কবিতা ৭০-৮০ বেরিয়েছিল গয়না বিক্রি করে। আমার মাতৃসমা এক নারী তাঁর হাত থেকে লুকিয়ে বালা খুলে দিয়ে বলেছিলেন, প্রথম কপিটা আমাকে দেবে। এদিকে বাড়িতে তো কোনও উপার্জন নেই। আমি একটু-আধটু গান জানতাম। সেই সময় আমি সাইকেলে চড়ে পাড়ার ভিতরে বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েদের গান শিখিয়ে রোজগার করতে শুরু করলাম। রবীন্দ্রসঙ্গীতই শেখাতাম এবং তাদের গান শিখিয়ে মঞ্চে গাইবার উপযুক্ত করে তুলতাম। আমাদের একটা দলও ছিল। সেই দলের হয়ে আমি তখন রীতিমতো হোলটাইমার সিঙ্গার ছিলাম বলা যেতে পারে। আমার পাড়ার এক দাদা ছিল। সে মান্না দে-র গান গাইত। অনুষ্ঠানের শুরুতে আমি দুটো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতাম, পাঁচ-ছ’টাকা পেতাম। আর দাদা তার পরে গাইত মান্না দে-র গান। ও পেত আট-ন’টাকা করে। যেদিন পেতাম, সেদিন খুব পেটভরে খেতাম। ওই দাদার সঙ্গে অনেক খেয়েছি, অনেক দোকানে বসে, রাস্তার ধারে...খিদেটা একটা সাংঘাতিক ব্যাপার। আমার কবিতায় বারবার খিদের কথা, খাওয়ার কথা ফিরে ফিরে আসে। এখনও লিখতে গেলে আসে, এমনকী, আজ সকালেও যে-কবিতাটা লিখেছি, তাতেও খিদে আছে।
প্র: ‘সরস্বতীর হাত’ কবিতায় যে দাদার কথা বলা আছে?
উ: হঁ্যা, ‘সরস্বতীর হাত’। কিংবা ‘আড়াই হাত মানুষের কবিতা’...আসলে সে সময় যেটা হয়েছিল, জান, কোনও প্রেমের অনুভূতি থেকে আমার কবিতা লিখতে আসা নয়। কোনও মেয়েকে দেখে কবিতা লিখতে আসার ঘটনাটা একেবারেই ঘটেনি আমার জীবনে। এটা আমার পক্ষে ভাল না খারাপ হয়েছে, তা অবশ্য জানি না। তবে যে-ঘটনাগুলোর কথা আমি বললাম, সেগুলো একেবারে সরাসরি আমার কবিতা ৭০-৮০ তে উঠে এসেছে। কবিতা যে লিখব, এরকম কোনও পরিবেশ আমার পরিবারে ছিল না। একটা তাড়া খাওয়া, ভেসে আসা, বিপন্ন পরিবার এবং বেশ বড় পরিবার...বাবা স্কুলে সামান্য শিক্ষকতা করতেন। তাঁকে আমি খুব বেশিদিন পাইনি। কিন্তু এই বাবার কথা কেন জানি না, বারবার আমার কবিতায় ফিরে এসেছে এবং এখনও আসে। বাবাকে নিয়ে আমি যত কবিতা লিখেছি, সম্ভবত গত পঞ্চাশ বছরে কোনও বাঙালি কবি নিজের বাবাকে নিয়ে এত কবিতা লেখেননি। বাবাকে এত কম পেয়েছিলাম বলেই কি না জানি না...অথচ এই বাবাই কিন্তু ছেলেবেলায় আমার কাছে অনেকটা হিটলারের মতো ছিলেন। আমায় পড়াতেন, আর না পারলে বেদম মারতেন। পাবনা জেলার মানুষ তো, খুব বদরাগী ছিলেন। কিন্তু পরের দিনই বাজার থেকে সবচেয়ে ভাল আমটা কিনে এনে আমাকে দিয়ে বলতেন, খেয়ে দ্যাখ। নিজেও আম খেতে খুব ভালবাসতেন। এই যে বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক, আগের দিন বেদম মার আর পরের দিন আম, তার মধ্যেই একটা বিপন্ন পরিবারে বাবাকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা, ছেলেবেলাতেই এই ব্যাপারটা আমাকে স্পর্শ করেছিল। ‘ঋক্ষ মেষ কথা’-তেও, বিশেষ করে যেটা সনেটের অংশ, তা মূলত বাবার কথাতেই ভরে আছে।
প্র: ‘ঋক্ষ মেষ কথা’ ঠিক কবে লেখা হল?
উ: এম এ ওয়ান। ‘ঋক্ষ মেষ কথা’ আমি যখন লিখছি, তখন আমরা পাত্র মার্কেটে থাকি। বইটার নাম থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সব কিছুই বেশ দুর্বোধ্য। সম্ভবত আমার লেখা সবচেয়ে দুর্বোধ্য কবিতার বই ওটা। যদিও নিজের কবিতা পড়তে বেশ ভয় লাগে আমার, পড়িও না, তাও যখন কবিতাগুলো নিয়ে বসি, দেখি যে অনেক কবিতা আমি নিজেই বুঝতে পারছি না। আমি তখন কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির ছাত্র। ন’টা বত্রিশের লোকাল ধরে কল্যাণী আসতাম, এসে সারাদিনই কল্যাণীতে থাকতাম, প্রচুর ক্লাস ফাঁকি দিতাম। বেশির ভাগ সময়ই কাটাতাম লাইব্রেরিতে বা ঝাউবনে। এই সময় আমি লিখেছিলাম ‘ঋক্ষ মেষ কথা’, প্রায় রাত জেগে, পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়ে। বইটা যখন বেরোল তখনও আমি ছাত্রই। কৃষ্ণনগরে ছাপা ছ’টা কি সাতটা কপি পৌঁছেছিল কলকাতায়। তার মধ্যে একটা পৌঁছেছিল কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের কাছে। উনি আমাকে বই পড়ে একটা চিঠি লিখেছিলেন, ‘দুর্বোধ্যতার উপাসক’। এরকম মিষ্টি ও মধুর থাপ্পড়, আমি জীবনে আর খাইনি। তবে ভাল লেগেছিল। সেই সময়কার একটা ঘটনা আমি এখনও ভুলতে পারি না। হয়তো ‘ঋক্ষ মেষ কথা’র পিছনেও তার প্রভাব ছিল। তখন শরত্‌কাল । সকালবেলায় চৌধুরীপাড়ার ভাড়াবাড়িতে শুনতে পেলাম বেড়া পেরোনোর শব্দ, একজন ঢুকে দরজায় কড়া নাড়ল। দরজা খুলে দেখলাম গোরাদা। গোরাদা তখন নকশাল, কৃষ্ণনগরের ত্রাস। পুরোটা চাদর মুড়ি দিয়ে ঘরে এসে ঢুকল। তারপর ঝোলা থেকে মায়াকোভস্কির একটা কবিতার বই বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘তুই এটা পড়। এটা তোর কাজে লাগবে। কী অদ্ভুত, আমি জানি না...’ তারপর বলল, ‘আমার খুব খিদে পেয়েছে, দ্যাখ তো রুটি আছে কি না ঘরে।’ আমি মাকে গিয়ে বললাম, গোরাদা এসেছে, রুটি করে দাও। তারপর কী মনে হল, হঠাত্‌ করে উঠে ‘অন্য একদিন এসে খাব’ বলে বেরিয়ে গেল। তার ঠিক তিনঘণ্টা পরে নেদের পাড়ায় গোরাদা শত টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। ওর ব্যাগের গ্রেনেড, বার্স্ট করে। কৃষ্ণনগরের এই গল্পগুলো আমাদের রোজকার জীবনের অঙ্গ ছিল। গোরাদাকে আমি আমার চেতনা থেকে কখনও সরাতে পারিনি। কেন জানি না মনে হয়, এই যে আমি আমার কলকাতার রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, কলেজ থেকে বেরোচ্ছি, পার্ক স্ট্রিটে বইয়ের দোকানে গিয়ে বসছি, সেখান থেকে বেরিয়ে বালিগঞ্জ চলে এলাম, সেখান থেকে মধুসূদন মঞ্চে নাটক দেখতে ঢুকলাম...সব কিছুতেই যেন মনে হয়, আমার পিছনে একটা অদৃশ্য শহর, একটা ছোট্ট শহর, যার নাম কৃষ্ণনগর, সে-ও একইভাবে হেঁটে চলেছে। তাকে নিয়েই কলকাতার ভিতরে চলাফেরা করছি। ফলে এখন যখন লিখি, এই দুটো শহরই আমার ভিতরে কথা বলে।
প্র: নকশাল-এর পর খানিকটা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম ধরনের কিছু আন্দোলন হয়েছে বটে। তবে এরকম সর্বগ্রাসী আন্দোলন বা ত্রাস বাংলায় এল না বলেই কি বাংলা সাহিত্য ‘সাফার’ করছে কোথাও?
উ: ‘নকশাল আন্দোলন’ এর হ্যাংওভার ছেড়ে এখনও মানুষ বেরোতে পারেনি। সেই নকশাল আন্দোলনের যে-ঢেউ, যা প্রতিটা ঘরে ঘরে এসে পৌঁছেছিল। এখন যে-পশ্চিমবঙ্গে আমরা আছি, সেটা একটা পরিবর্তনের পট। আমি যে-নকশাল আন্দোলনের কথা বলছি, তার পরেও একটা পরিবর্তন হয়েছিল। একটা দীর্ঘ শাসন আমরা দেখেছি। তার ফলে একটা নতুন রাজনৈতিক সময় ও সামাজিক বিন্যাস তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, প্রতিটা সময়ই তার নিজের চরিত্র অনুসারে অসম্ভব ইউনিক। এখন এই মুহূর্তে যে- সময়ে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে সাংঘাতিক কবিতা উঠে আসার কথা। এমন একটা সময়ে এসে পৌঁছেছি আমরা, যে-সময়টাকে না পারছি আমরা পুরোপুরি ভাল বলতে বা পুরোপুরি খারাপ বলতে, না পারছি ভিতরে পুরোপুরি আত্মসাত্‌ করতে, না পারছি পুরোপুরি ফেলে দিতে। এই যে এ একটা ‘জানি না কী হবে এরপর’ নাম দেওয়া যেতে পারে এই সময়ের, এই সময় থেকে আরও কবিতা উঠে আসা দরকার। কিংবা এমনটাও হতে পারে, হয়তো পরবর্তী সময়ে আমরা এর প্রতিফলন দেখতে পাব। তবে এটা মনে হয় যে, এই মুহূর্তে কবিতা যত না পারছে, নাটক তার চেয়ে অনেক বেশি করে পারছে। নাটক এই সময়কে অনেক বেশি করে তুলে ধরছে, অনেক সাহসী পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা আমরা কবিতায় পাচ্ছি না। গদ্যে তো নয়ই। বাংলা গদ্য প্রায় মিইয়ে পড়েছে বলা যায়। লড়াইটা খুব কঠিন। বাংলা বাজারটাও কিন্তু অমিতাভ ঘোষেরা নিয়ে নিচ্ছেন। আগামী পঁচিশ বছরে ওটা বেড়ে চারগুণ হবে। সেদিক থেকে কবিতা অনেক গা ঝাড়া দিয়ে উঠতে পারে যে-কোনও সময়। ভাল প্রবন্ধ, ভাল প্রাবন্ধিক কোথায়! বাংলা সাহিত্যেই এর আকাল চলছে। অন্য কোথাও, মরাঠি বা কন্নড়ে কিন্তু ব্যাপারটা এরকম নয়। সেখানে শিল্প-সাহিত্যের সমালোচনা খুব দৃঢ় এবং প্রত্যয়ী। সেটা অনেক কিছু শাসন করে। কন্নড় প্রাবন্ধিক নাগরাজকে অনন্তমূর্তিও সমীহ করতেন। আর-একজন বুদ্ধদেব বসুকে তো বাংলায় দরকার!
প্র: মল্লিকা সেনগুপ্তের সঙ্গে আপনার আলাপ কীভাবে হয়েছিল?
উ: মল্লিকার সঙ্গে আমার আলাপ খুব অদ্ভুতভাবে। ওই ন’টা পঁয়ত্রিশের লোকালেই ওকে প্রথম দেখলাম। আমাদের এক বন্ধু ছিল, যে ট্রেনে খুব দুষ্টুমি করত, সে হঠাত্‌ বলল, ‘‘তুই তো ভাল র্যাগিং করিস। ওই যে মেয়েটা জানলার কাছে বসে রয়েছে, ফার্স্ট ইয়ারের, লম্বা, ছিপছিপে, হাতে বই...ওকে র্যাগিং করতে পারবি?’’ তখন র্যাগিং ব্যাপারটা ছিল অনেকটা ঠাট্টা-ইয়ার্কির মতো। আমি চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিলাম। সে আমায় বলল, “সাবধানে র্যাগ করিস, খুবই ভাল ছাত্রী।” আমি গেলাম র্যাগিং করতে, র্যাগিং করে ফিরেও এলাম বন্ধুর কাছে। ও আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠল। তারপর আমাকে দেখিয়ে সকলকে বলল, ‘‘এই যে, র্যাগিং করতে গিয়েছিল, কিন্তু নিজেই র্যাগড হয়ে ফিরে এসেছে।” হয়তো সত্যিই র্যাগড হয়ে ফিরে এসেছিলাম সেদিন। এই হচ্ছে মল্লিকার সঙ্গে আলাপ। তখন মল্লিকা কবিতা লিখত না। কিন্তু আমি ছ’মাসের মধ্যেই ওকে কবিতা লেখার প্রস্তাব দিলাম। বললাম, “আমরা একটা লিট্ল ম্যাগাজ়িন করছি, তুমি একটা কবিতা লিখে দেবে?” ও বলল, ‘না, আমি তো লিখি না, বরং প্রবন্ধ লিখে দিতে পারি।” আমরা বললাম, “না না, প্রবন্ধ আমরা ছাপি না।” ও খুব গম্ভীর হয়ে বলেছিল, “তা হলে তো আমার কিছু লেখা হবে না। কবিতা-টবিতা আমি লিখব না।” কিন্তু আমার সেদিন থেকেই কেমন যেন জেদ চেপে গেল। আবার একদিন গিয়ে বললাম, “তুমি ডায়েরি লেখ?” ও বলল না , ডায়েরি লিখতে যাব কেন!” আমি বললাম, “কেন, ডায়েরি লিখলেও তো পারো।” ও বলল, “না, আমি ডায়েরি-টায়েরি লিখব না।” সুতরাং দ্বিতীয় দিনও আমি বিশেষ সুবিধে করতে পারলাম না। তবে ব্যাপারটা শুরু হল। তখন ওর সঙ্গে আমার পরিচয় আর-একটু ঘনিষ্ঠ হয়েছে। আমি বললাম, “লেখো না, মাথায় যা আসে, যেমনভাবে আসে, তা-ই লেখো।” কিন্তু ও যথারীতি রাজি হল না।
প্র: উনিও রাজি হচ্ছেন না, আর আপনিও হাল ছাড়ছেন না। তাই তো?
উ: ঠিক তাই। এরকম চলতে-চলতে প্রায় আট-ন’মাস পরে ও আমায় একদিন বলল, “কয়েকটা লেখা লিখেছি, একটু পড়তে হবে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী লেখা?” তখন ও বলল, “ওই আর লিখেছি কিছু একটা”। কিছু একটা বলা মানেই ধরে নিতে হবে, ওটা কবিতা। পরবর্তীকালের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, লোকে গল্প, উপন্যাস বা প্রবন্ধের ক্ষেত্রে পরিষ্কার বলে যে, সে কী লিখেছে, কিন্তু কবিতা লিখেছে, কেউ বলতে চায় না। সে যা-ই হোক, ওই খাতাটা আমি পেলাম এবং পেয়ে চমকে গেলাম। ওখানে যে-কবিতাগুলো লেখা ছিল, সেগুলো আমি এক অধ্যাপককে পড়ালাম। কৃষ্ণনগরের একটি ভাঙাচোরা প্রেস থেকে বের হল প্রচ্ছদহীন, প্রস্তাবনাহীন, শুধু ক’টি কবিতা নিয়ে ২৪ পাতার একটা বই ‘চল্লিশ চাঁদের আয়ু’। মল্লিকা ডাকযোগে কয়েকটি বই পাঠিয়েছিল এবং যাঁদের হাতে পৌঁছেছিল, তাঁদের একজনের নাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সুনীলদা সেবারের পয়লা বৈশাখে অনেক নামী-নামী লেখকদের বইয়ের আলোচনা করতে গিয়ে তার পাশাপাশি এই বইটির কথাও উল্লেখ করেছিলেন- ‘‘সর্বশেষ এই বইটি আমার হাতে এসে পৌঁছেছে, পাতলা চটি বই। ‘চল্লিশ চাঁদের আয়ু’, নতুন কবি, তার নাম মল্লিকা সেনগুপ্ত।’’ এতে মল্লিকা খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছিল। আসলে নতুন লিখতে আসা কোনও ছেলে বা মেয়ের পক্ষে এটুকুই মোটিভেশন হিসেবে যথেষ্ট ছিল। তখন থেকেই ও কবিতা লেখার জগতে পুরোপুরি ঢুকে পড়ল। আমাদেরও শুরু হল একটা নতুন জীবন।
প্র: আপনাদের দু’জনের ‘সোহাগ-শর্বরী’-র পিছনের ভাবনাটা কী ছিল?
উ: ‘সোহাগ শর্বরী’ হচ্ছে এর ঠিক পরে-পরেই প্রকাশিত আমাদের দু’জনের কবিতার বই। আমাদের বিয়েটা ছিল প্রথা ভাঙার বিয়ে। সব কিছুতে প্রথা ভাঙতেই হবে এরকম একটা ব্যাপার। ভাদ্রমাসে আমরা ইচ্ছে করেই বিয়ে করি, যেহেতু ওই মাসে কোনও বিয়ে হয় না। দুই বাড়িতে প্রচুর রাগারাগি হয়েছিল এই নিয়ে। এই বিয়েতেও আমরা সই ছাড়া বিশেষ কিছু করিনি, কিছু বন্ধু-বান্ধব এসেছিল। অনেকে আবার আসেননি রাগ করে। বিয়ের রাতেই আমাদের দু’জনের এই কবিতার বই ‘সোহাগ শর্বরী’ প্রকাশিত হয়। বইটির দু’জন প্রকাশক ছিলেন। কবি পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল এবং কবি সুতপা সেনগুপ্ত। ‘অভিমান’-এর ব্যানারে বইটা বেরিয়েছিল। প্রকাশক হিসেবে আলাদা করে দু’জনের নাম ছিল না। গৌতম চৌধুরীও ছিলেন আমাদের সঙ্গে, আমার খুূব ছোটবেলার বন্ধু। এরকম ভাল বন্ধু খুব কমই পেয়েছি জীবনে। যদিও ওর সঙ্গেও এখন আর দেখা হয় না। এই সোহাগ-শর্বরীই ছিল আমাদের বিয়ের একমাত্র উপাচার। বইটার নাম দিয়েছিল মল্লিকা। তেরোটা কবিতা ছিল। সেখানেও একটা ছক ভাঙার খেলা। তেরো সংখ্যাটা তো অশুভ বলেই সকলে জানে। আমরা ইচ্ছে করেই তেরোটা কবিতা রেখেছিলাম। বিয়ের পরে আমাদের বন্ধুরা অনেকে বলেছিল, এই বিয়েটা টিকবে না। বিয়েটা কিন্তু টিকেছিল পঁচিশ বছর। বলা যায়, বিয়েটা টিকেছে আমৃত্যু। কিন্তু কিছু অভিমানী বন্ধুর মনে হয়েছিল বিয়েটা টিকবে না। বলা যায়, এই পঁচিশ বছর পরে সত্যিই ওদের কথাটা ফলে গেল।
প্র: এটা খুব অদ্ভুত যে, আপনি ও মল্লিকা দু’জনেই প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং আপনাদের সময়ে খ্যাতিমান কবি হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিত্ব বা কবিসত্তার কোনও সংঘাতের কথা শোনা যায় না, যদিও সেটা আপনাদের মধ্যে আসা খুবই স্বাভাবিক ছিল...
উ: প্রেমে ক্ল্যাশ থাকবে না, এটা তো হয় না। একটা ব্যাপার বলি, মল্লিকার লেখা খুব বোল্ড ছিল। তাতে হয়তো অনেকেরই মনে হয়েছে যে, ওর সঙ্গে আমার ব্যক্তিত্বের সংঘাত হবে। কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি। ছোটবেলায় মানে আমাদের বিয়ের পর-পরই, (ওই সময়টা এখন আমার কাছে ছোটবেলাই মনে হয়) মল্লিকা একটি সাক্ষাত্‌কারে বলেছিল, একসঙ্গে সংসার করতে গেলে দু’জনের মাঝে-মধ্যে বেধে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক, যায়ও হয়তো। কিন্তু ওই ‘অভিমান’ (এখানে চলচ্চিত্র অভিমান-এর কথা বলা হয়েছে) সিনড্রোমটা আমাদের নেই। এমন তো অনেকবারই হয়েছে, কেউ আগে বিদেশ গিয়েছে। মল্লিকাই আমাদের মধ্যে প্রথম বিদেশ গিয়েছিল, সাতাশ বছর বয়সে, সুইডেনে, অনেক নামী লেখকের সঙ্গে। আমি গিয়েছি পরে। কেউ হয়তো একসঙ্গে কোথাও ডাক পাইনি। একজন গিয়েছে মুম্বই, অন্যজন দিল্লি। কখনও কারও বইয়ের উপর প্রচারের আলো বেশি এসে পড়েছে। বিশেষ করে মল্লিকার ‘স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণ’, ‘সীতায়ন’ বা ‘কথামানবী’ নিয়ে প্রচুর আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা এসবে কেউ কিছুই মনে করিনি। এগুলো বাদ দিয়ে যা পড়ে থাকে, তা হল সংসারে মতামতের জায়গা। তা, সংসারটা ছিল মল্লিকার একারই। আমি ছিলাম ওর সঙ্গে থাকতে আসা একটা লোক, যেন হঠাত্‌ করে ঢুকে পড়েছি। ব্যাঙ্কের ফাইল, এলআইসি-র কাগজপত্র সবই মল্লিকা গুছিয়ে রাখত। আমি কিছুই জানতাম না। ও চলে যাবার পর প্রায় এক বছর আমার লেগেছে সব কাগজপত্রগুলো রিঅর্গানাইজ় করতে। তা-ও বেশির ভাগটাই করে দিয়েছে মল্লিকার ভাই। মল্লিকা চলে যাওয়ার পর সংসারের হালও ধরেছিল ওর ভাই-ই। তখনই আমি সত্যিকারের সংসার করতে শুরু করলাম, পঁচিশ বছর সংসারে থাকার পর।
প্র: মল্লিকা, আপনার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাঁর এই আকস্মিক প্রস্থান কীভাবে মানিয়ে নিয়েছেন? আপনি কি কোনও বিশেষ দর্শনে বিশ্বাসী?
উ: এটা এমন একটা ঘর, যেখানে খাট, টেবিল, বই, জলের গ্লাস সব সাজানো-গোছানো রয়েছে। আর আমি যেন একটা আহত জন্তু, সারা গায়ে জখম নিয়ে ঘরের এক কোণে বসে আছি। কত রাত গিয়েছে, ঘুম আসছে না। মাঝরাতে উঠে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বসে আছি। ওরও ঘুম আসছে না। তারপর একটা সময় ভেবে দেখলাম, এভাবে তো চলবে না। রাত্রে কেউ তো আমায় দেখতে আসছে না। আমার ছেলেও বাইরে গিয়ে বলছে না যে, আমি আর বাবা কাল সারারাত জেগে ছিলাম। ও এমনিতেও খুব ইনট্রোভার্ট। আমাদের সকলেরই একটা নিজস্ব জগত্‌ রয়েছে। যেমন, কবিতার জগত্‌। সেই জগতে অনেক সংঘর্ষ রয়েছে, অনেক লেগপুলিং আছে, অনেক ব্যাক বাইটিং আছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে, আবার অনেক আনন্দও আছে। সেখানেই আমাকে ফিরতে হবে। এই সিদ্ধান্তটা আমি নিতে পেরেছিলাম। যেদিন আমি উঠে দাঁড়ালাম সেদিন দেখলাম, আমি ঠিকভাবে রাস্তা পেরোতে পারছি, মেট্রোয় উঠতে পারছি, প্লেনে উঠতে পারছি, বিদেশ যেতে পারছি, আবার বিদেশ থেকে ফিরেও আসতে পারছি ঠিক মতো। তখনই আমি নিজেকে প্রবল বকুনি দিয়ে একটা কবিতায় লিখলাম, “শোক এবং হানিমুন দুটোর একটাও দীর্ঘস্থায়ী নয়।” এটা আমার কাছে একটা দর্শন ছিল। মানুষের জীবনে তো মৃত্যু আসতে বাধ্য। রবীন্দ্রনাথ কতরকম মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েছেন। প্রথমে স্ত্রীর মৃত্যু, ছেলের মৃত্যু, মেয়ের মৃত্যু...ভাবি, এত আপনজনের মৃত্যু মানুষটা সহ্য করেছেন কীভাবে! সেই তুলনায় আমার শোক তো কিছুই নয়। আমি সংসারের দায়িত্বটা পালন করতে শিখলাম। এখন আমার নিজেকে একজন সক্ষম মানুষ বলে মনে হয়। আমি জানি যে, আজকের বিকেলটা খুব সুন্দর। কালকের বিকেলটা আমি না-ই দেখতে পারি। তাহলে কি আমার সংসারটা আর চলবে না? আমার ছেলে কি তাহলে খেতে পাবে না? এই কথাটা আমি ভাবতেও পারি না। কাজেই কাল আমি না থাকলেও আমার ছেলের যাতে কোনও কিছু থেমে না যায়, তার সমস্ত ব্যবস্থা আমি করে রেখেছি। বলা যেতে পারে, দ্বৈপায়ন হ্রদ থেকে আমি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। এতদিন সেখানে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিলাম। ভীম যেমন দুর্যোধনকে টেনে এনে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড় করিয়েছিল। মল্লিকার মৃত্যুও আমাকে স্বাবলম্বী করে জীবনের রণাঙ্গনে এনে দাঁড় করাল। আমি অর্ধেক ছিলাম, বাকি অর্ধেক অনুভব করিনি।
প্র: এই দীর্ঘ কবিজীবনে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার কতখানি মূল্যবান হয়ে দেখা দিল কিংবা কোন মাত্রা যোগ করল?
উ: পুরস্কার একটা আলো, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিছু ক্যামেরা ঝলসে ওঠে, কিছু আলো এসে পড়ে। কিন্তু তার পরেরটাই অন্ধকার। আবার একথাও সত্যি যে, পুরস্কারটা একটা স্বীকৃতিও বটে। কোনও কোনও লেখক থাকেন, যাঁরা জন্মানই পুরস্কার পাওয়ার জন্য। পুরস্কারের তকমা দিয়ে আমি কাউকে বিচার করি না। যাঁরা নোবেল প্রাইজ় পেয়েছেন এবং যাঁরা পাননি, দুটো তালিকা দেখেই চমকে উঠতে হয়। যাঁরা প্রাইজ় পাননি, তাঁরাও যে কত মহান ব্যক্তিত্ব বা সাহিত্যিক বোঝা যায়। নদীর দু’পাড়ের মতো, পুরস্কারের দু’ধারেই ভাল লেখক আছেন। ইদানীং আমার একটা কথা ব্যক্তিগতভাবে মনে হচ্ছে, অকাদেমি পুরস্কার তো কেন্দ্রীয় সরকারের পুরস্কার, সাহিত্যের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। আমার ভাল লেগেছে, সকলের যেমন লাগে। কিন্তু এই পুরস্কারটাই আমাকে এমন একটা জিনিস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, যে-কথাটা আগে আমি সেইভাবে ভাবিনি।
প্র: কী কথা সেটা?
উ: পুরস্কারটা আমায় মনে করিয়ে দিল, বাংলা বা পশ্চিমবঙ্গ কিন্তু আমাকে কোনও পুরস্কার দেয়নি। এই কথাটা এতদিন মনে হয়নি, কিন্তু সেদিন মনে এল। এটা তো আমার একটা দুঃখ বা কিছুটা রাগেরও জায়গা হওয়া উচিত। আমি তো এতদিন বাংলা ভাষা নিয়েই কাজ করলাম। কিন্তু তা-ও আমার কোনও ক্ষোভ হয় না। কারণ, কাকদ্বীপ থেকে কোচবিহার পর্যন্ত যারা আমার পাঠক, আমার কবিতাকে চেনে। একদিন বসিরহাটের মঞ্চ থেকে কবিতা পড়ে নেমে আসছি, দেখি, গাছতলায় একজন মেয়ে আর তার মা দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ‘গায়ে হলুদ’ বলে আমার একটা কবিতা, ‘যে মেয়ের বিয়ে হয়নি কোনওদিন...’ সেই মেয়েটিকে দেখে ও তার হাতে ‘গায়ে হলুদ’ কবিতাটা দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। মেয়েটি বলেছিল ওই কবিতার তলায় আমাকে একটা সই করে দিতে। সইটা করতে-করতে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমার কবিতা তুমি পড়? মেয়েটি উত্তর দিয়েছিল, এই কবিতার মেয়েটাই তো আমি। এটা তো আপনি আমাকে নিয়েই লিখেছেন। এই কথাটা আমার কাছে একইসঙ্গে থাপ্পড় এবং পুরস্কার হিসেবে এসেছিল। তারপর থেকে গত পঁয়ত্রিশ বছরে আমার এটুকু বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে,আমি যেরকমই লিখি না কেন, আমার কিছু পাঠক তো আছেন। যেভাবে আমি কবিতা লিখেছি, অর্থাত্‌ কবিতার নিজস্ব যে-প্রতিষ্ঠান অর্থাত্‌ কবিতার বিন্যাস, তার চাল এবং চলন যে-প্রতিষ্ঠান তৈরি করে, আমি তার বিরোধিতা করেছি। রাজপথ ছেড়ে আমি কানাগলিতে দাঁড়িয়ে কবিতা লিখেছি। যেভাবেই লিখি না কেন, সেটা যে ওই মেয়েটাকে স্পর্শ করছিল বা কোচবিহারের গগনকে স্পর্শ করেছিল বা কাকদ্বীপের দেবদুলালকে স্পর্শ করেছিল- এটাই আমার প্রাপ্য। যাদের নাম বললাম, আমি তাদের মুখ দেখেছি। কিন্তু যাদের মুখ দেখিনি, তারাই তো আমার আসল পাঠক। পাঠক পেয়েছি বলেই কিন্তু আমার পুরস্কার নিয়ে রাগ, দুঃখ, অভিমান, ক্ষোভ কিছুই হয় না।
প্র: আপনার বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও তো অনেক বিতর্ক তৈরি হয়েছে...
উ: আমি গলা তুলে একদিন বামপন্থীদের সমর্থন করেছি। কিন্তু তারপরও তো নন্দীগ্রাম থেকে নেতাই তৈরি হল। তখন বলতে পারিনি। এখন বলব। সেই আমি যখন অর্পিতাকে সমর্থন করলাম, তখন আমার উপর বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কুত্‌সা রটালেন, মানসিকভাবে নির্যাতন করলেন। আমি সব উত্তর কবিতায় দেব। ওঁরা একদিন সমরেশ বসুকে ঘুমোতে দেননি, তারাশঙ্করকে দালাল বলেছেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে কাঁদিয়েছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে প্রতিক্রিয়াশীল বলেছেন। আমি তো কোন ছার! আমার মাথায় যাঁরা নোংরা ফেলে দিয়ে উল্লাস করছেন, আমি তাঁদের উত্তর দেব কবিতায়।
প্র: ‘ভাষানগর’-এর মতো একটি অভিনব প্রয়াসের ইতিহাস শুনতে চাই।
উ: আমার কাছে একসময় দেশ মানে ছিল প্রথমে কৃষ্ণনগর ও তারপর কলকাতা। সেভাবে কোনও দেশের কনসেপ্ট ছিল না আমার। প্রথম যখন ভোপালে গেলাম- সুনীলদা ও নবনীতাদি আমায় পাঠিয়েছিলেন- সেখানে ‘ভারত ভবন’ বলে একটা বিরাট ব্যাপার ছিল। ভারত ভবনে গিয়ে দেখলাম মরাঠি, তামিল, অসমিয়া বিভিন্ন ভাষার কবিদের সমাবেশ। মনে হল আমার সামনে যেন একটা বিস্ময়কর ভারতবর্ষ দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমার যে একটা দেশ আছে, এটা যেন আমার মাথাতেই ছিল না। এদের কবিতা শুনতে শুনতে মনে হল আমার একটা দেশ আছে, যেখানে এতগুলো ভাষার অস্তিত্ব। আশ্চর্য হয়ে গেলাম যে, এই সব ভাষাতেও আমাদের মতো কবিতা লেখা হয়। এটা যখন আবিষ্কার করলাম, তখন মনে হল যে, একটা পত্রিকা বের করা দরকার। অন্য ভাষার কবিতা কী করে অনুবাদ করা যায়, সেগুলো কীভাবে বাঙালি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, এসব নিয়ে আলোচনা করছি, এমন সময় একটি ডিনার পার্টিতে অশোক বাজপেয়ী আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন আলাদা করে। বললেন, আমরা যদি কোনও পত্রিকা বের করি, ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষার কবিতা নিয়ে, তা হলে আর্থিকভাবে ‘ভারত ভবন’ বেশ কিছুটা সাহায্য করতে পারে। আমরা বলেছিলাম, বাকিটা আমরা করে নেব। ভাষানগর একটি লিট্ল ম্যাগাজ়িন, ভারতীয় কবিতার বাংলা পত্রিকা, তবে মাঝে-মাঝে আমরা ইংরেজি সংখ্যাও বের করি। এইভাবে শুরু হল ভাষানগর। সম্প্রতি একটি ইংরেজি সংখ্যা বেরিয়েছে। শঙ্খবাবু সেই ইংরেজি সংখ্যাটির মোড়ক উন্মোচন করেছেন। পঁচিশ বছর ধরে অনেক কষ্ট করে আমরা ভাষানগর বের করেছি। মাঝখানে বেশ অনিয়মিত হয়ে গিয়েছিল এই পত্রিকা। মল্লিকা যখন হাসপাতালে ছিল, ভাষানগর বেরোচ্ছে না বলে খুবই দুঃখ করত। সে সময় দু’-তিনবছর ভাষানগর বন্ধ ছিল। এখন অবশ্য আবার প্রকাশিত হচ্ছে। তবে একথা বলতেই হবে যে, চিরকালই তরুণ প্রজন্মের কবিরা ভাষানগরকে ভালবেসে তার পাশে দাঁড়িয়েছে, ভাষানগর নিয়ে তাদের উত্‌সাহ ও উদ্যমের কোনও কমতি ছিল না, সেই আগ্রহ এখনও কমেনি।
প্র: বিভিন্ন বিদেশি ভাষার বা অন্যান্য দেশীয় ভাষার কবিতার নিরিখে বাংলা কবিতা এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?
উ: আমি কি ডাইনোসর? উত্তর কি দিতে পারব? বাংলা কবিতার জায়গাটা ভারতবর্ষে চিরকালই খুব সম্মানের। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে দেখি যে, অন্য ভাষার লোকজনের বাংলা কবিতা নিয়ে যে-আগ্রহ রয়েছে, বাঙালিদের মধ্যে কিন্তু অন্য ভাষার কবিতা নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই। সব ভাষা তো জানা সম্ভব ময়, সেক্ষেত্রে একটু ঠকে গেলেও চোখ বন্ধ করে অনুবাদকের উপর ভরসা করতেই হয়। তা ছাড়া পৃথিবীর সব বিখ্যাত কবিতা তো আমরা অনুবাদেই পড়েছি। যা-ই হোক, অন্য ভাষার কবিতার অনুবাদ পড়ে অন্তত মনে হচ্ছে যে, ভাল কবিতা শুধু বাংলাতেই লেখা হচ্ছে, এমন নয়। অন্য ভাষায় কিন্তু বাংলার চেয়েও ভাল কবিতা লেখা হচ্ছে। মণিপুরি ভাষায় অসম্ভব ভাল কবিতা লেখা হচ্ছে। বিদেশে কিন্তু আবার পুরোপুরি অন্য ব্যাপার। সেখানে কিন্তু বাংলা কবিতা নিয়ে কোনও আলোড়ন নেই। ২০১০ সালে আমি মস্কো গিয়েছিলাম একটি লেখকদলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দিতে, সেখানেও দেখলাম এবং ২০০৭ সালে গ্রিসে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে গিয়েও দেখলাম যে, বাংলা কবিতা নিয়ে তাদের বিশেষ কোনও ধারণা নেই। সবচেয়ে বড় কথা, রবীন্দ্রনাথের দেড়শো বছর পূর্তিতে আমেরিকায় বাংলা কবিতার প্রতি এমনকী, রবীন্দ্রনাথের প্রতিও কারও কোনও বিশেষ আগ্রহ দেখলাম না। এখানে বসেই খালি আমরা শুনে যাই, বাংলা কবিতার নাকি বিদেশে খুব বাজার রয়েছে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা তো তা বলছে না। বাঙালি কবিদের এটা বুঝে নেওয়ার সময় হয়েছে।
প্র: বাঙালি কবিরা কি এটা বুঝছেন না?
উ: না, বাঙালি কবিরা খুব খুশি। নিজেদের নিয়ে ছোট জায়গার মধ্যে থাকতে তারা খুব ভালবাসে। কেউ বাইরে গেলে, বৃহত্তর জগতে পা রাখলে তাকে নিয়ে তারা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে। সুনীলদা যখন সাহিত্য অ্যাকাডেমির সভাপতি হলেন, তখন অনেককেই বলতে শুনেছি, ওসব করে কী হবে, ওখানে আবার কেউ যায় নাকি! আসলে বাঙালি হল কাঁকড়ার জাত, সুযোগ পেলেই বড় কোনও জায়গায় কেউ গেলেই টেনে নামানোর চেষ্টা করে। বাঙালি কবিরা, বহুদিন আগে শঙ্খবাবু লিখেছিলেন, কলেজ স্ট্রিটের বোতলে আটকে আছে। এই খাঁচা থেকে আমরা বেরোতে পারি না। এই আমাদের দোষ। আমরা অন্যের কবিতা, অন্য ভাষার কবিতা পড়ে দেখি না। তা দেখলে নিজের সম্পর্কে সচেতন হতাম। আসলে আমরা ধরেই নিই যে, আমরা ফরাসিদের মতো লিখি, লাতিন আমেরিকানদের স্টাইলে বাঁচি। আর বাংলা সাহিত্যে এই লাতিন আমেরিকান দাদাগিরিটাও আর সহ্য করা যায় না।
প্র: সেটাই স্বাভাবিক নয় কি? বাঙালিদের নিজস্ব সাহিত্যতত্ত্ব কোথায়?
উ: ভারতীয় সাহিত্যতত্ত্বের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। আমি তো মনে করি হোয়াইট পোয়েটিক্সকে যদি কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারে, তো সেটা একমাত্র ইন্ডিয়ান ও আফ্রিকান পোয়েটিক্স। পোয়েটিক্সের কেন কোনও জাত বা বর্ণ থাকবে? সেটা তো ইউনিভার্সাল হওয়া উচিত। কিন্তু তা তো হয় না। সারা পৃথিবীতেই এই বিভাজন রয়ে গিয়েছে। বাংলায় একজন বুদ্ধদেব বসু এসেছিলেন, যিনি একই সঙ্গে বোদল্যের এবং কালিদাস অনুবাদ করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এখান থেকেই তো তৈরি হতে পারত একটা ইউনিক পোয়েটিক্স, আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে যেতে পারত। বাংলা ভাষার সেই ক্ষমতা ছিল এবং আছে। কিন্তু বাঙালিরা অন্যদের সাহিত্য সম্পর্কে বড় বেশি উদাসীন। আমি আমার সমস্ত বন্ধু-বান্ধব এবং বাংলা সাহিত্যের অনুরাগীদের বলতে চাই, দয়া করে একটু অন্য ভাষার দিকে নজর দিন। খুবই দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, বাইরে গেলেই বাংলা সাহিত্য প্রসঙ্গে অমিতাভ ঘোষের নাম আসে, অথচ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে পেপার পড়তে দেখি না!
প্র: তাই? অথচ সুনীলদাই তো বাঙালিদের মধ্যে একজন বর্ণময় ‘বিশ্ব মুখ’...
উ: নিশ্চয়ই। সুনীলদা বাংলা সাহিত্যের একজন টাওয়ারিং পার্সোনালিটি। তিনি ভারতবর্ষের সমস্ত শহরে গিয়ে কবিতা পড়েছেন। তাঁর লেখা ইংরেজিসহ বহু ভাষায় অনুবাদ হয়েছে, প্রচুর পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁর লেখা থেকে নাটক হয়েছে, ফিল্ম হয়েছে, স্বয়ং সত্যজিত্‌ রায় তৈরি করেছেন, তা সত্ত্বেও তাঁঁকে নিয়ে বিদেশে গড়ে উঠল না কোনও ‘স্কুল অফ থট’, যেটা অমিতাভদের নিয়ে হয়েছে।
প্র: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন আপনি। ওঁর ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল না?
উ: আমি সুনীলদার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেয়েছি, এক টেবিলে বসে চা-কফি খেয়েছি, নিজের জীবনটা ভাগ করে নিয়েছি, এগুলো ভেবে আমার খুব গর্ব হয়। ওঁর ছায়া থেকে যে বেরিয়ে আসার কোনও দরকার আছে, এটা কোনওদিন মনেই হয়নি। ইন ফ্যাক্ট, এই প্রশ্নটা আমাকে ভাবাল। আমার কবিতায় ওঁর প্রভাব নিঃসন্দেহে আছে। কিন্তু লেখায় প্রভাবের কথা ধরলে আরও বহু লোকের প্রভাব আছে আমার লেখায়। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শঙ্খ ঘোষ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, নিকানর পাররা এমনকী, আজকের জেনারেশনের যে-নতুন ছেলেটি আমার ছেলের বয়সি, আমাকে কবিতা দেখাতে আসছে, তার দর্শনও আমাকে ক্রমাগত প্রভাবিত করে চলেছে। আমার জীবনে আসলে সুনীলদা ছিলেন একটা স্থির নক্ষত্রের মতো। টি এস এলিয়ট সম্ভবত একেই বলেছিলেন still centre। যখন মল্লিকা চলে গেল, আমি মনে করেছিলাম, সুনীলদা আমার জীবনের একটা বড় অবলম্বন। সুনীলদার চলে যাওয়ার খবরটা আমি পেয়েছিলাম আমেরিকার ম্যানহাটানের এক আন্তর্জাতিক কবি সম্মেলনে। তখন আমার সে কী অবস্থা! থাকতেও পারছি না ওখানে, আবার ফিরতেও পারছি না। অবশ্য তখনকার অবস্থা বললে ভুল হবে, আসলে এখনও আমার একই অবস্থা। থাকতেও পারছি না, ফিরতেও পারছি না। মল্লিকা যখন ছিল, তখন মনে করতাম, এবার আমায় মল্লিকার কাছে ফিরতে হবে। মল্লিকা যখন থাকল না, ভাবতাম আমি ফিরব সুনীলদার কাছে।
প্র: সুনীলদার চলে যাওয়া আপনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে নিশ্চয়ই...
উ: এখন কারও কাছে আমার ফেরা নেই। কীরকম যেন ছন্নছাড়া লাগে নিজেকে। খুব যখন একা লাগে, একা কোনও কফিশপের টেবিলে হয়তো বসে আছি, আমার সুনীলদার কথাই মনে হয়। কতজন তো কতরকম মন্তব্য করেছে আমাকে আর সুনীলদাকে নিয়ে। সম্প্রতি শরত্‌দাও ‘বইয়ের দেশ’-এর সাক্ষাত্‌কারে বলেছেন যে, আমি নাকি ওঁর গাড়ির দরজা খুলে দিতাম! আমার খুব মজা লেগেছে। শরত্‌দা আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ। আমি একটুও রাগ করিনি। শুধু বলতে চাই, ওঁর কথায় একটু ভুল ছিল। শুধু গাড়ির দরজা খোলা নয়, সুনীলদার সমস্তরকম দরজা খুলে দেওয়ার কাজ করতে আমি রাজি ছিলাম। আসলে সুনীলদা এমন একটা মানুষ ছিলেন, যিনি কাউকে ‘না’ বলতে পারতেন না। যদি ওঁর কোনও দোষ থেকে থাকে, তা হলে আমি বলব এই ‘না’ বলতে না পারাটাই ওঁর দোষ ছিল। একজন অত্যন্ত ভাল মানুষ ছিলেন তিনি এবং সকলের জন্য আন্তরিকভাবে যতটা পেরেছেন, করেছেন। অথচ তার পরেও তাঁঁকে কত লোকে কত মন্দ কথা শুনিয়েছে, রটিয়েছে। খুব সম্প্রতি তসলিমা নাসরিনও বললেন। আমার ধারণা, সুনীলদা কষ্ট পেয়েছিলেন খুব। কিন্তু একবারের জন্যও বুঝতে দেননি। এরকম অনেকেই আছেন, যাদের অন্ন জুগিয়েছেন সুনীলদা, পরে তারাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি বিদ্ধ করেছে। আসলে বড় মানুষদের জীবনে এটা বোধ হয় খুব স্বাভাবিকভাবেই ঘটে থাকে।
প্র: সাহিত্য অ্যাকাডেমির পত্রিকা ‘ইন্ডিয়ান লিটারেচার’ সম্পাদনা করার অভিজ্ঞতা কেমন?
উ: ‘ইন্ডিয়ান লিটারেচার’-এর অভিজ্ঞতা অনেকটা ‘ভাষানগর’-এর মতোই। ভাষানগর মূলত ছিল বাংলায়, আর এটা ইংরেজিতে। জওহরলাল নেহরু মনে করছিলেন দু’টি পত্রিকা দিয়েই সমস্ত ভারতবর্ষকে বেঁধে ফেলা যায়- একটা হিন্দিতে ‘সমকালীন ভারতীয় সাহিত্য’ এবং ইংরেজিতে ‘ইন্ডিয়ান লিটারেচার’। ‘ভাষানগর’-এ আমরা কলকাতায় বসে যে-কাজটা অনেক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে করতাম, ইন্ডিয়ান লিটারেচার-এ সেই কাজটাই আরও ভাল করে মন দিয়ে স্বাধীনভাবে করতে পেরেছিলাম। দিল্লিতে থাকাকালীন আমার ঘরে কখনও মরাঠি, কখনও মণিপুরি কখনও আবার বোরো ভাষার কবি ঢুকে পড়ছেন, আমার মনে হত একটা গোটা ভারতবর্ষের মধ্যে জীবন্ত আমি হেঁটে বেড়াচ্ছি। কাজটা আমি খুব ভালবেসে করেছিলাম, ব্যাপারটা অধ্যাপনার মতো নিয়মমাফিক নয়। আমার ভালবাসার চিহ্নগুলো ওখানে হয়তো এখনও ছড়িয়ে আছে। মল্লিকাও চেয়েছিল খুব, যাতে আমি ওই কাজটা করি। কিন্তু একটা সময় সেটা আর সম্ভব হল না। বিশেষ করে শেষের দিকে, যখন মল্লিকা হাসপাতালে ভর্তি হল, তখন সিদ্ধান্ত নিলাম, এবার আমাকে ফিরে আসতেই হবে। চাকরিটা ছেড়ে আবার ক্লাসরুমে ফিরতে হল। যদি অবসর নেওয়া পর্যন্ত কাজটা করতে পারতাম, হয়তো সত্যিই দীর্ঘস্থায়ী কোনও ছাপ রেখে যেতে পারতাম।
প্র: সাম্প্রতিক ঘটনা ছায়া ফেলে আপনার কবিতায়। আপনার গল্প বলার ঢংয়ে অনেকে আপনার মধ্যে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর আদল খুঁজে পান? এ বিষয়ে আপনি নিজে কী মনে করেন?
উ: আমি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর চতুর্থ সন্তান। ডি এন এ টেস্ট করার দরকার নেই। মিল আছেই তো। আমি গল্প ছাড়া জীবনের কোনও অংশকেই আজ অবধি ধরতে পারিনি। আমার কাছে শুধু বিশুদ্ধ অনুভূতি বলে কিছু হয় না। ধরা যাক, রাগ হল। কিন্তু তার পিছনেও তো একটা গল্প আছে। এমনি কোনও অনুভূতির সৃষ্টি হয় না। ছোট থেকে শুনে এলাম, মাস্টারমশাই থেকে শুরু করে বড়-বড় কবিরাও বলছেন, গল্পটা কবিতা থেকে সরিয়ে রাখা দরকার, নইলে কবিতা দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু আমি তো বরাবরই গল্পের মধ্যে দিয়েই কবিতা লিখি। সেটাকে বাদ দিয়ে দিলে কবিতার যেটা মূল গুণ, অর্থাত্‌ স্বতঃস্ফূর্ততা সেটাই তো নষ্ট হয়ে যাবে। ইন ফ্যাক্ট, আমার কবিতা লেখার পিছনেও একটা গল্প আছে। সেটার কথা অনেকবার অনেক জায়গাতে উল্লেখও করেছি আমি। আমি তখন ক্লাস ইলেভনে পড়ি। আমরা কৃষ্ণনগর স্টেশনে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়েছিল একটা লোক, একটু ভবঘুরে ধরনের। সে ঘুরঘুর করছিল। এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেনটা ঢুকছে, সেই সময় হঠাত্‌ সে লাফ দিল। সকলে তো হইহই করে উঠল। ভেবেই নিল যে সে কাটা পড়েছে। আমি ঝুঁকে পড়ে দুই কোচের মাঝখান দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি, ঠিক কী হয়েছে। আর তখনই দেখি, দু’নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সে-ও একটা পাউরুটি হাতে নিয়ে দুই কোচের মাঝখান দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে, আমরা কী করছি। আমার দিকে চোখ পড়তেই তার মুখে মৃত্যুকে জয় করার যে-অদ্ভুত হাসিটা খেলে গেল, তার কোনও তুলনা নেই! ওই হাসিটাই সেদিন রাতে আমাকে দিয়ে জীবনের প্রথম কবিতা লিখিয়েছিল। হয়তো সেই কবিতাটা হারিয়ে গিয়েছে, কিন্তু সেই হাসিটা আজও আমার জীবন থেকে মুছে যায়নি। ওই হাসিটা কিন্তু এখনও আমি বহু জায়গায় দেখে চলেছি। ওই হাসিটাই যেন পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বিহার হয়ে, আফ্রিকা, সাব-সাহারান দেশগুলো পেরিয়ে, আমেরিকা থেকে লাতিন আমেরিকায় ছড়িয়ে গিয়েছে। এই হাসিটার মৃত্যু নেই, এই হাসিই আমাকে আজও লিখিয়ে চলেছে।
প্র: আপনি তো একসময় প্রচুর সনেট লিখেছেন...
উ: ১৫৫টা সনেট লিখেছি আমি ‘সনেট সিকোয়েন্স’-এ। সংখ্যাটা মজার। শেক্সপিয়র সনেট লিখেছিলেন ১৫৪টা। ভেবে দেখলাম শেক্সপিয়রকে তো কোনওদিন হারানো যাবে না। একটা সংখ্যা দিয়ে যদি হারানো যায়, এই আর কী! যাই হোক, সেই সনেটের পিছনেও প্রবলভাবে গল্প রয়েছে। আসলে আমি আমার মতো করে একটা কথা চিরকাল বিশ্বাস করে এসেছি। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, শঙ্খ ঘোষ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কোলরিজ বা অ্যালেন গিন্সবার্গের কবিতাতেও গল্প রয়েছে। শুধু নীরেন্দ্রনাথের কবিতায় গল্প আছে, একথা আমি মানতে রাজি নই। তা ছাড়া আমি প্রধানত গদ্যে কবিতা লিখি, যার জন্য গল্প ব্যাপারটা আরও বেশি করে মনে আসে। কাল যদি সেগুলোকে আমি বসে বসে ছন্দে ট্রান্সফার করি, জানি না সেগুলো কী পদার্থ তৈরি হবে! আমি ইচ্ছে করেই ছন্দটাকে স্যাক্রিফাইস করেছি। আমার ইচ্ছেই ছিল আমি কবিতার গা থেকে সমস্তরকম অলঙ্কার খুলে ফেলব। তাছাড়া ‘বনলতা সেন’ বা ‘দুই বিঘা জমি’, এগুলো ছন্দে লেখা। কিন্তু তাতে কি গল্প নেই? আসলে আমার যেসব কবিতা গ্রামে-গঞ্জে লোকে আবৃত্তি করে, সেগুলো গদ্যে লেখা। অথচ ৬০ শতাংশ কবিতা আমার ছন্দে লেখা, যার কথা কেউ বলেন না। ধরেই নেওয়া হয়, কবিতায় আমি গল্প বলি। সে আমার কবিতায় আমি গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, উপন্যাস, যা খুশি বলতে পারি, দেখতে হবে ওটা শেষপর্যন্ত কবিতা হয়ে উঠতে পারল কি না। অজস্র নির্ভুল ছন্দে লেখা কবিতা হারিয়ে গিয়েছে, ঠিক যেমন অজস্র নির্ভুল গদ্যে লেখা কবিতা হারিয়ে যাবে।
প্র: গদ্যটাই আলাদা করে তাহলে সেভাবে লিখলেন না কেন?
উ: তা-ও বটে। তবে চান্স পাইনি। চান্স পেলে ফাটিয়ে দিতাম। তখন আমার কবিতা লেখাটাই জরুরি মনে হয়েছিল বলে ২৬টা কবিতার বই হয়ে গিয়েছে। এখন মনে হচ্ছে, অনেক হয়েছে, আবার মন দিয়ে গদ্য লিখতে হবে। আসলে কবিতা আর বিজ্ঞান, দুটোই কমবয়সে মাথায় খেলে ভাল। র্যাঁবো, বোদল্যের, জীবনানন্দ এমনকী আইনস্টাইনও জীবনের সেরা কাজগুলো করে গিয়েছেন অল্প বয়সে। গদ্য জিনিসটা আসলে পরিণত বয়সের ফসল। তবে অলরেডি দুটো নাটক লিখে ফেলেছি। আরও দুটো শেষ করব খুব তাড়াতাড়ি। আসলে প্রচুর নাটক দেখি, দেখলে ভিতরে কেমন যেন একটা উত্তেজনা হয়। নাটক আর পেন্টিং আমায় খুব টানে।
প্র: আপনার কবিতায় এত রাগ কেন? স্ল্যাং-এর প্রয়োগ? ‘আমার শরীরে করমচা কাঁটা জন্মায়’ কবিতাটা মনে পড়ে গেল...
উ: রাগ কি না বলতে পারব না। আমি তো মফস্সলে মানুষ। কলকাতায় এসেও আমার মনে হয়েছে এর মধ্যে একটা বৃহত্তর কলকাতা রয়েছে, যারা সরাসরি এই শহরের বাসিন্দা না হলেও তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই সব প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে আমি একাত্ম বোধ করেছি চিরকাল। কারণ, আমার মনে হয়েছে এই প্রান্তিক মানুষদের বাদ দিয়ে ভারতবর্ষের সাহিত্য বা রাজনীতি, কোনওটাই সম্ভব নয়। এদের বঞ্চনার কথা বলতে গেলে রাগের একটা বহিঃপ্রকাশ তো ঘটবেই। আর স্ল্যাং বা খিস্তি-খেউড়ের কথা যদি ধরা যায়, এখন তো বাংলা চলচ্চিত্র বা নাটকে এই ব্যাপারটাকে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই কাজটা কিন্তু বাংলা কবিতা অনেক আগেই করে গিয়েছে। অরুণ কুমার সরকার, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শক্তি-সুনীল হয়ে অনেক আগেই ঘটে গিয়েছে। তবে একটা কথা আমার মনে হয়, এগুলোকে আসলে ব্রহ্মাস্ত্রের মতো ব্যবহার করা উচিত। তাতে প্রভাবটা ভাল হয়। আমার ক্ষেত্রে কখনও কখনও এরকম হয়েছে যে, তূণীরে আছে বলেই ছুড়ে দিয়েছি। সেটা হয়তো সব সময় ঠিক করিনি। অর্জুনের কাছে যেমন ছিল পাশুপত, আমেরিকার কাছে নিউক্লিয়ার বোম, তেমনই কবির হাতে থাকে স্ল্যাং। অস্ত্র ব্যবহার না করাটাই অস্ত্র।
প্র: আরও একটু নিরপেক্ষ হওয়া উচিত ছিল বলতে চাইছেন?
উ: ‘নিরপেক্ষ’ কথাটার বহু অর্থ হয়। এগিয়ে থাকা মানুষজন যে কেন্দ্রভূমিতে ফিরতে চান, তার নাম নিউট্রালিটি দেওয়া যেতেই পারে। যদিও নিরপেক্ষতাও যে আসলে রাজনীতি, সেটা বুঝতে আমার সময় লেগেছে। তবুও আমার মনে হয় কবিদের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ হওয়ার জায়গা খুব কম। কবিরা কোনও না-কোনও পক্ষ নিতে বাধ্য। ‘উলঙ্গ রাজা’-তে নীরেনদা ওই শিশুটির পক্ষ নিয়ে লিখছেন বা সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখছেন ‘কাল মধুমাস’। রাজনীতি শুধু নয়, প্রেমের কবিতাতেও তো কবিরা সাধারণত প্রেমিকের পক্ষ নিয়ে নেন। ‘কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’ পড়ে সেই প্রেমিকের প্রেমে পড়ে যেতে হয়, যে তার প্রেমিকাকে এভাবে বর্ণনা করছে। প্রতিটি প্রেমের কবিতাই তো আসলে আত্মবিজ্ঞাপন! সেটা না হলে তো প্রেমের কবিতা হবেই না।
প্র: কবি হিসেবে আইডলাইজ় করেছেন কাউকে?
উ: কবির চেয়েও বেশি করেছি কবিতাকে। তবে চিলির কবি, নিকানর পাররাকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। কলেজ লাইফে ওঁর লেখা প্রচুর পড়েছি। ওঁকে আমি দেখেছিলাম সব সময় একটা নোটবই নিয়ে ঘুরছেন, এমনকী, খেতে-খেতেও টুক করে নোট করে নিচ্ছেন, অন্য কাজ করতে করতেও কিছু একটা দেখে লিখে রাখছেন। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, যা লিখছেন, সেগুলো কি কবিতা? ওঁর উত্তরটা চমত্‌কার ছিল, যা কিছু লেখা হয়, তাই কি সব সময় কবিতা হয়? তবু আমি লিখে রাখি। হয়তো এর থেকেই কবিতা উঠে আসবে একদিন। মনে হয় আমার যদি কোনও আইডল থেকে থাকেন, তো সেটা উনিই। তবে এ তো গেল অনেক দূরের কথা। শঙ্খ ঘোষের কবিতা চিরকালই অসাধারণ মনে হয়েছে আমার। ওঁর বাড়ি গিয়েছি কয়েকবার, আলোচনা করেছি, তর্কও হয়েছে। কিন্তু সুনীলদার মতো ওঁর সঙ্গে আমি আড্ডা মারিনি, মদ খাইনি, বিদেশ যাইনি। আসলে সুনীলদা ও শঙ্খবাবু আমার কাছে একটা ক্লাসে দু’জন ফার্স্টবয়ের মতো। একজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া যায়, অন্যজনকে দূর থেকে সমীহ করতে হয়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িও খুব যেতাম আমি, আমার নায়ক তিনি। আমার দুভার্গ্য যে, আমি অরুণকুমার সরকার বা সমর সেনকে দেখিনি। নীরেনদার কাছে একসময় হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতাম কিছু শিখব বলে। বহুদিন আমরা আনন্দবাজারে গিয়ে সুনীলদার ঘরে আড্ডা মেরেছি। নীরেনদার কাছে একসময় আড্ডা হত না, কিন্তু ওঁর কাছে সব সময়ই আমি কিছু
না-কিছু শিখেছি। আমাকে আর মল্লিকাকে উনি একটা কথা বলেছিলেন, “কবিতা লিখতে এসেছ, সঙ্গে একটা দাঁড়িপাল্লা রাখবে। নিন্দা বা প্রশংসা দুটোই ওজন করে দেখবে, তারপর যেটা রাখার সেটা রাখবে, বাকিটা ফেলে দেবে।” কথাটা মল্লিকা প্রায় শেষদিন পর্যন্ত মনে রেখেছিল। আমি মোটেও মৌলিক নই, অযোনিসম্ভূত নই। আমি বহুজনের হাড় থেকে, ত্বক থেকে, লালা থেকে, অশ্রু থেকে জন্ম নিয়েছি।
প্র: কবিতার পর নাটক, গদ্য...আর কোনও ভবিষ্যত্‌ ভাবনা রয়েছে?
উ: আমি সকালে উঠে চল্লিশ মিনিট হেঁটে আসার পর কবিতা নিয়ে বসি বা পড়াশোনা করি। দুপুরে আমার ছাত্রছাত্রী, কলেজ, আর সহঅধ্যাপক-অধ্যাপিকাদের সঙ্গে আমার জীবন। বিকেল থেকে সন্ধেবেলায় নাটক, এগ্জ়িবিশন, আলোচনা সভা, টেলিভিশন, পার্টি, পলিটিক্স, পরচর্চা...সব কিছুই রয়েছে। আমার জীবনের মোটামুটি এই তিনটে পর্ব। ক্রিকেটের পরিভাষায় অনেক রকম বল আসে, সেগুলো মেরে খেলব, না ঠুকে খেলব, সেসব স্ট্র্যাটেজি নিয়েও ভাবতে হয়। তাছাড়া, ওরে বাবা, কবি, বিশেষ করে বাঙালি কবি হতে গেলে বেশ সাহস লাগে। এই কবিতার জগতে এত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এত টক্সিন যে, কোনও নতুন লিখতে আসা ছেলে বা মেয়েকে দেখলে আমার খুব মায়া হয়। ভাবি যে, একেও বাংলা কবিতার বিষ পান করতে হবে এবং তারপর সারা শরীরে সেই বিষ নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে! অবশ্য শুধু কবিতা কেন, নাটক, গান বা সিনেমাতেও তাই...বিষপান করে বেঁচে থাকতে হয়। তবে একটা জিনিস ঠিক করেছি, আর কিছু যদি লিখতে নাও পারি, একটা আত্মজীবনী তো লিখবই। বাংলায় যেমন বুড়ো না হলে কেউ আত্মজীবনী লেখে না, কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যে দেখা গিয়েছে বা সমসাময়িক ভারতীয় ধারা অনুসরণ করলে দেখব, দলিত লিটারেচার বলতে যা বোঝায়, যেমন মরাঠি, মলয়লি বা কন্নড়ের কোনও প্রান্তীয় মানুষ কিন্তু নিজের জীবনকে উপজীব্য করেই বিখ্যাত হচ্ছেন। অর্থাত্‌, এদের লেখকজীবনের শুরুই হচ্ছে অটোবায়োগ্রাফি দিয়ে। এখানে অনেকে আত্মজৈবনিক উপন্যাস লেখেন। আমি অবশ্য উপন্যাসের বাহানা না করে আত্মজীবনীটাই লিখব ঠিক করেছি।
প্র: এত বিষ...তাও দিনের শেষে কবিতা কী দেয় যে, তার কাছেই ফিরে আসতে হয়?
উ: কবিতা আমায় অনেক দিয়েছে। নিয়েওছে অনেক কিছু। তবুও দেওয়ার পরিমাণটা বেশি বলেই আমি সেটুকুই মনে রাখতে চাই। সুন্দরবনের সেই যে বিয়ে না হওয়া মেয়েটি এবং এই যে আরও অসংখ্য অজস্র টুকরো টুকরো দৃশ্য মিলিয়ে আজকের আমি হো হো করে হাসছি, বা মাথা গুঁজে বসে আছি। এই সবটাই কবিতার দান। কবিতা ছাড়া কোথায় ফিরব তাহলে! কুষ্ঠ হলে কি স্বর্গে যাওয়া যায় না?