সাক্ষাত্কার অরিন্দম চক্রবর্তী

| |

ফিলজ়ফির উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রত্যেককে তর্ক করতে শেখানো। যত তর্ক করবে, তত ভাল।
উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তিনি অনায়াসে মিলিয়েছেন স্পষ্টবাদিতা। দর্শনচর্চা তাঁর কাছে এক সজীব, সক্রিয় মননের প্রতিফলন। অরিন্দম চক্রবর্তীর মুখোমুখি সুমন সেনগুপ্ত।

সুমন: অসাধারণ হওয়ার উপায় হল একেবারে জেনেশুনে সাদাসিধে সাধারণ হওয়া- সাধারণতার এই অসামান্য সামান্যতা অর্জন করা এত কঠিন কেন?
অরিন্দম: অসাধারণ হওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জেনেশুনে আটপৌরে সাদাসিধে থাকা- এই ইচ্ছেটাই তো দুর্লভ! আমি দেখছি যে, সকলেই যদি সাধারণ হতে পারে, তাহলে তো ব্যাপারটা অস্বাভাবিক হবে। সাধারণ হওয়া কি সহজ ব্যাপার? খুব কঠিন। তার কারণ, সাধারণ হওয়ার জন্য সব সময় একটা কথা মাথায় রাখতে হবে। চব্বিশ ঘণ্টা। তা হল, আমার যেমন বিভিন্ন চাহিদা আছে, আমার যেমন প্রতিভা আছে, তেমন কিন্তু প্রত্যেকেরই আছে।
সংস্কৃতে তো ‘সামান্য’ মানে অল্প নয়। সাধারণ। ‘কমন সেন্স’ তো কমন বটেই। এই কথাটা বলেই দেকার্তে তাঁর ‘ডিসকোসর্’ বই শুরু করেছেন। তো, আমি কী সুবাদে পুরস্কার চাইছি? সত্যি হয়তো ভাল করে দেখলে আমার চেয়ে অনেক খারাপও আছে, আমার চেয়ে ভালও আছে আর আমার সমান প্রচুর লোক আছে। প্রচুর। তো, এখন ক’জনকে পুরস্কার দেওয়া হবে? মনে পড়ছে, যখন হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দিলাম, ফার্স্ট হলাম না কেন? এমনকী, গুরুদেব শ্রীশ্রীঠাকুরও রেগে আগুন “চন্দন কেন সেকেন্ড হল?” ফার্স্ট হওয়ার মধ্যে কী আছে? আসলে ফার্স্ট হওয়া নিয়ে রেষারেষি করতে পরিবেশ বাধ্য করে। আর বাঙালিদের মধ্যে চিরকালই এই ফার্স্ট হওয়া আবার বিরাট একটা ব্যাপার। এখনকার বাচ্চাদের, ছোট ছেলেমেয়েদের তো দেখি কম্পিটিশনের চোটে সব মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে! শরীরও খারাপ হচ্ছে। আত্মহত্যার কথা প্রায়ই খবরের কাগজে দেখতে পাচ্ছি।
প্র: এগিয়ে যাওয়ার লড়াইয়ে তো একটা স্ট্রেস...
উ: হ্যাঁ। স্ট্রেস! কারণ, আমাকে এক্সেল করতে হবে। কারণ, এটা কম্পিটিশনের জগত্‌। এতে অবশ্য শুধুমাত্র বাঙালিদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। এটা হচ্ছে সেই খোলাবাজারের রাজনীতির ব্যাপার। এবং অবশ্যই অর্থনীতি। বিশেষত, শিক্ষার ক্ষেত্রে এই স্ট্রেস বাড়ানো অলিম্পিকতুল্য হাড্ডাহাড্ডি... ‘এগিয়ে যাওয়ার লড়াই’। এ এক রকমের হলিউড ভার্শান অফ ডারউইন! যে যত লড়াকু, সে তত অগ্রগামী! এ নীতিতে আমি একটুও বিশ্বাস করি না। এর নেপথ্যেই রয়েছে সেই প্রতিযোগিতা। আর আমি এটা দেখানার চেষ্টা করেছি, আমার বই ‘ভাতকাপড়ের ভাবনা এবং কয়েকটি আটপৌরে দার্শনিক প্রয়াস’-এর ‘হিংসা, ঈর্ষ্যা, অসূয়া’ অধ্যায়ে। প্রতিযোগিতার মধ্যে আছে একটা অসূয়া। অথচ সাধারণ হওয়া মানে সোজা কথায় মিলেমিশে থাকা। আর এটা মনে রাখা যে, আমার যে-যন্ত্রণা, সেরকম সকলেরই আছে। যেমন ধরো অসুখের সময়...রাসেলের খুব সুন্দর একটা লেখা আছে ‘প্রাইড ইন ইলনেস’। রাসেল বলছেন, মানুষের মধ্যে একটা ব্যাপার আছে যে, আমার গাড়িটা ভেঙে যাচ্ছে। আমার গাড়িটা চলছে না। এটা নিয়ে কেউ অহংকার করে না কিন্তু মানুষের নিজের শরীর? বুদ্ধিমান, পয়সাওয়ালা সুস্থ মানুষ স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে আমার কত রোগ আছে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা করে!
প্র: রোগ নিয়ে প্রতিযোগিতা? ব্যাপারটা ঠিক কী রকম?
উ: ঠিক তাই। এই যেমন তুমি বললে, আমার পায়ে লিগামেন্টের একটা সমস্যা আছে। আমারও অমনি ভিতরে-ভিতরে মনে হল, আরে, আমার যা পায়ের সমস্যা, তা তোমার চেয়ে অনেক বেশি! একজন আমাকে বলল, আমার ব্লাড সুগার আছে। আমি বললুম, আমার যা হাই প্রেশার! যেন একটা প্রেস্টিজের ব্যাপার, এটা বলতেই হয়! শেষ পর্যন্ত আমি দেখাতে চাই, আমি যা সাফার করি... ওই যে বলছিলুম না, দুঃখ, সেই দুঃখ দিয়ে দুঃখের বাজিমাত করা। তো, তার জন্য প্রতিযোগিতা। এমনকী, ‘আমি যে বেশ ভালই আছি অন্তত নই দুঃখে কৃশ/ এই কথাটা পদ্যে লিখতে/ লাগে বড়ই বিসদৃশ।’ আমার যা কষ্ট! এটাও প্রতিযোগিতা।
প্র: এসবের মূলে তাহলে কী আছে?
উ: কোনও না-কোনও একটা গ্রুপে অথবা ক্রাইটেরিয়নে আমি সবার চেয়ে সৌভাগ্যে না-হোক দুর্ভাগ্যে, চালাকিতে না-হয়, অন্তত বোকামিতে এগিয়ে আছি এটা দেখাতে হবে। এই খেলাই তো চলছে সারাক্ষণ। আর আমি যদি বলিও বা... কিন্তু আমি সেজন্য বলি না যে, এই ক্লাসের মধ্যে আমি সবচেয়ে অধমাধম মূর্খ! কারণ, এটাও কিন্তু একটা প্রাইড! তুমি লজিক্যালি একটু ভেবে দেখো...
প্র: তার মানে রবীন্দ্রনাথের কথায় সেই দীনতার অভিমান?
উ: হ্যাঁ, ঠিক। আর সবচেয়ে ট্র্যাজিক হচ্ছে কেউ যদি বলে, আমার কোনও গুণ নেই, কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে আমি খুব মডেস্ট তাহলে কী দাঁড়াল? তার মানে কথাটা তো এই তুমি নিজেকে কন্ট্রাডিক্ট করছ। তোমার বিনয়টা মেকি। তো এসবই হচ্ছে, অসাধারণ হওয়ার চেষ্টা করা। ভাল উপায়ে না-হোক, মন্দ উপায়ে। কিন্তু এটা যেমন আমি বললাম, তেমন বাংলায় যাকে বলা ভাল কাজ করা তা হল, সাধারণের জন্য কাজ করা। এখন আমার যেটা অবসেশন হয়েছে, সেটা হচ্ছে ইকুয়ালিটির কথা মনে রাখা। সেজন্য প্রাইজ় পাওয়া নিয়ে একটা অস্বস্তিতে ভুগছি। খুবই গ্রেটফুল লাগছে। কিন্তু কৃষকদের আত্মহত্যার কথা লিখে লাখ টাকা রোজগার করাটা কেমন-কেমন লাগছে।
প্র: কী ধরনের সাম্যের কথা বলতে চাইছেন?
উ: ফরাসি বিপ্লবের তিনটে কথা জানো তো। স্লোগান। লিবার্টি, ইকুয়ালিটি আর ফ্র্যাটার্নিটি। তুমি কোনও সময়ে পড়ে দেখতে পারো, এই ফ্র্যাটার্নিটি নিয়ে কিন্তু আজকাল কেউ কোনও কথা বলে না। সেটা হচ্ছে বন্ধুত্ব, সৌভ্রাতৃত্ব। আগে আমাদের বলা হত হিন্দি-চিনি ভাই-ভাই! নেহরু বলতেন। এখন তো আর কেউ ভাই-ভাই বলে না। এখন আর-একটা দেশ মানে তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করো। অথবা বিজ়নেস পার্টনার। কোথায় ভাই-ভাই আর কোথায় বিজ়নেস পার্টনার! হ্যাঁ, যা বলছিলাম পড়ে দেখতে পারো, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর লেখা একটা উপন্যাস আছে। আমি এক্ষুনি নামটা ভুলে যাচ্ছি। হ্যাঁ, মনে পড়েছে, ‘বাল্মীকির জয়’। বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসের খুব প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু হরপ্রসাদকে বললেন, তুমি প্রবন্ধ-টবন্ধ লেখো। পণ্ডিত মানুষ তুমি, কিন্তু উপন্যাসটা লিখো না। খুব ভাল রিভিউও করেছিলেন। কিন্তু তারপর তিনি প্রায় উপন্যাসটা চেপেই দিলেন! এরপর হরপ্রসাদ ভাল উপন্যাস আর তেমন লেখেননি। তো, এই উপন্যাসের শেষটাতে একটা প্রচণ্ড ইমোশনাল সিন আছে। আকাশ থেকে একজন দেবদূত নেমে আসছেন... আর বলছেন আমরা সকলে ভাই-ভাই। তো এই ফ্রেন্ডশিপ... এর হয়তো দু’-একটা খারাপ দিক আছে। সিস্টাররা বাদ পড়ে যায়, শুধুই ব্রাদারহুড! কিন্তু এটা হওয়ার বদলে এখন যেটা হচ্ছে, সেটা হল উত্‌কট স্বাধীনতা। ব্যক্তিস্বাধীনতা। বাচ্চা তার মায়ের থেকে স্বাধীন। ছাত্র তার শিক্ষকের থেকে স্বাধীন। শিক্ষকেরা আবার প্রধানশিক্ষকের থেকে স্বাধীন। প্রত্যেকে নিজস্ব একটা কিছু করার চেষ্টা করছে।
প্র: ঠিকই বলেছেন। কিন্তু এতে অন্যায় কোথায়?
উ: না। এর ভাল দিকও আছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ভাল দিকও আছে। কিন্তু এর উল্টো পিঠটা হচ্ছে একাকিত্ব! যৌথ পরিবারে কিন্তু কোনও একাকিত্ব ছিল না। হ্যাঁ তোমার কোনও প্রিভেসি ছিল না সেখানে। আমাদের তো বাড়িতে দুর্গাপুজো হত। তা তুমি যে বলবে... আমার এক জ্যাঠামশাই তাঁর মাসিক রোজগার দু’শো টাকা আর আর-এক জ্যাঠামশাইয়ের মাসিক রোজগার কুড়ি হাজার টাকা। তো এই তিন-চারদিন দুই জ্যাঠামশাইয়ের ছেলেমেয়েরা আমাদের সঙ্গে একই পোশাক পরত। মা, জেঠিমা, দিদি, আইএএস অফিসারের বউ আর উদ্বাস্তু কলোনির পিসি সব এক ঢালাও বিছানায়। পুজোর সবক’টি দিন। এটা একটা ইকুয়ালিটি। এখন আমার ভয় হয় আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের ও সমাজের ঘোর ইনইকুয়ালিটি নিয়ে। আমি এখন বলি সমতা হচ্ছে তৃতীয়। ক্ষমতা, মমতা আর তৃতীয় স্থানে সমতা। (দ্রষ্টব্য ১৬ এপ্রিল ২০১৪ ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ উত্তর-সম্পাদকীয় প্রবন্ধ।)
প্র: ঠিক বুঝলাম না। একটু ব্যাখ্যা করে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলে ভাল হয়।
উ: ক্রমবর্ধমান নারীধর্ষণ আর একস্ট্রিম ইনইকুয়ালিটি- এই দুই-ই হচ্ছে আমাদের প্রধান সমস্যা। তো আমাদের ভোট দিতেই হবে। কিন্তু যে-দল এই দু’য়ের দিকে নজর দিচ্ছে না, তাদের ভোট দিয়ো না। তার কারণ, বেসিক একটা জিনিস। মানুষের যদি লজ্জা না-থাকে, আমি যতই খেটে থাকি না কেন, অধিকাংশই না খেটে, অন্যের পরিশ্রমের বিনিময়ে পয়সা পেয়েছে, কিন্তু বহুসংখ্যক বুভুক্ষু মানুষের সামনে একটা পঞ্চাশতলা বাড়ি তৈরি করে তার মধ্যে দু’শো পঁচিশজন ভৃত্য... এটা করছেন করুন, কিন্তু লজ্জা তো হবে একটা! কিন্তু কারও লজ্জা নেই! এমন ‘নৃশংস’ (মহাভারতের ভাষায়) বণিকের পদলেহী কোনও প্রধানমন্ত্রী যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটের জোরে ভারতের বিকাশও ঘটান সেই বিকাশের মুখে ছাই! যেখানে ভাগ না করে ভোগ করার জন্য লজ্জা থাকে না, মহাভারতের মতে, ‘সেখানে সত্যও থাকে না।’
মহাত্মা গাঁধীকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, ব্রিটিশদের মতো, আমেরিকানদের মতো ভারতবাসীর স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং কবে হবে? গাঁধীজি এর চমত্‌কার উত্তর দিয়েছিলেন। ম্যাথমেটিশিয়ানদের মতো উত্তর। তখন উত্তরপ্রদেশের নাম ছিল ইউনাইটেড প্রভিন্স... তিনি বলেন, আমাদের ইউপি-র যা লোকসংখ্যা, তা তোমাদের দেশের চেয়ে বেশি। তোমাদের এইটুকু দেশে এই স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং হওয়ার জন্য তোমাদের একশো-দেড়শো বছর ধরে সারা গ্লোবটাকে শোষণ করতে হয়েছে... এইটুকু বলে তিনি বললেন যে, আমাদের যা জনসংখ্যা বা আমাদের দেশের যা আয়তন, তাদের যদি এই স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং হতে হয়, তার জন্য ক’টা গ্লোব লাগবে বলো তো? যদি ভিন্ন গ্রহের মানুষকে ঘণ্টা প্রতি দু’টাকা বা ওই রকম মজুরি দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পারি, তাহলে যদি আমাদের দেশের জনসংখ্যার স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিংকে ওই জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। অবশ্য মঙ্গলগ্রহের কারেন্সির সঙ্গে এক্সচেঞ্জ রেট ঠিক করা একটু মুশকিল হতে পারে।
আর এদেশ থেকে ইনইকুয়ালিটি যাওয়ার নয়। নয় বলেই চাষিরা এইভাবে আত্মহত্যা করবে। আর আমরাও ভাবব, যাকগে আপদ গেছে! আমাদের ভালই হল। বিদেশ থেকে সব আসবে। সবই তো আসছে। কেন বিদেশ থেকে আসবে? যন্ত্র তো সবই পারে এখন। কম্পিউটারে কমান্ড দেব আর অমনি সব চাল-ডাল বেরিয়ে আসবে। এখন কথা হচ্ছে সেই কম্পিউটারে প্রোগ্রাম তৈরির জন্য কে খাটবে? কাউকে তো খাটতে হবে। খালি অন্যের ধনে পোদ্দারি করে ক’জনে থাকবে? সব উচ্চশিক্ষিত লোকেরা স্বপ্ন দেখছে গ্রামেট্রামে গিয়ে বলবে ‘বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে!’ তো, উপেন হবে কারা? আগে শোষণের আকৃতি ছিল প্রতিবেশীর উঠোন চষে দেওয়া। এখন দাঁড়িয়েছে উল্টো। পঞ্জাবে, অন্ধ্রে চাষের জমিতে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা কম্পিউটার কোম্পানির উঠোন গজিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অন্ন-বস্ত্রহীন চাষির পরিবার আত্মহত্যা না করে ন্যানো গাড়ি চড়লেই পারে!
প্র: কিন্তু কর্মবিমুখতা এখন একটা বহুমুখী সমস্যা। এরও তো অনেক দিক আছে...
উ: এখন এর সঙ্গে একটা কথা যুক্ত হয়ছে। প্রায়ই দোহাই দেওয়া হচ্ছে, আসলে এটা হচ্ছে একটা এনভায়রনমেন্টের সমস্যা। এটা হচ্ছে যথেষ্ট পেট্রোপণ্য নেই বলে। এটাও সমস্যা। যেন পেট্রোপণ্য যথেষ্ট থাকলেই আর কোনও সমস্যা থাকবে না। আসল সমস্যা কিন্তু ডিস্ট্রিবিউশনের। এই ধরো, নববর্ষ উপলক্ষে পার্টিতে আমরা যাই। এখন সেই পার্টির আয়োজন করতে যা খরচ, তা দিয়ে একটা গোটা গ্রামের মানুষজনকে ভালমতো একবেলা খাওয়ানো যেত। এটা ভেবে একটু লজ্জা তো হবে মানুষের! তা নয়, আমি কোথায় উঠে এসেছি দেখো!
এখন গরিব মানুষও আর এ নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা ভাবে, তোমরা তোমাদের মতো থাকো। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, দারিদ্র ভাল। দারিদ্রও মানুষের মধ্যে অসূয়ার জন্ম দিতে পারে। এসব কথা আমি বলার চেষ্টা করি। আমরা যাকে নিম্নমধ্যবিত্ত বলি, আমাদের শিক্ষিত মানুষজনের সেভাবে থাকা উচিত।
প্র: তা কীভাবে সম্ভব?
উ: হ্যাঁ। একথা বললেই লোকজন রে-রে করে উঠবে। বলবে, এটা কি সোভিয়েত রাশিয়া করবে নাকি? সকলকে রেশন করে দেবে? এখন তো সবাইকে বোঝানো হয়েছে, ব্যক্তিগতভাবে সবাই উন্নতি করতে পারে। ‘ছুটলে বিকাশ থামায় কে?’ কিন্তু এটাকে তো আমি উন্নতিই বলি না। আসলে আমি এসব কথা বলতে পারি। কারণ, আমার স্ত্রী-ও দর্শনের অধ্যাপিকা। আমাদের দু’জনেরই পাকা চাকরি আছে। তিনি আমার লেখা-টেখা পড়েন। শুধু তাই-ই নয়, আরও অনেক কিছু করেন। আমি রান্না করতে জানলে কী হবে, গাড়ি চালাতে জানি না।
প্র: আপনাদের তো একটিই মেয়ে, তাই না? তার তোলা আপনার ছবি বইয়ের জ্যাকেটে দেখলাম।
উ: হ্যাঁ। আমার সন্তানের বয়স বাইশ বছর। সে কী করে বড় হয়ে উঠল তা টের পাইনি। বি এ পাশ করে এখন দিব্যি চাকরি করছে।
প্র: এই মুহূর্তে নতুন কিছু নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন?
আমি একটা জিনিস নিয়ে এখন কাজ করছি। ত্বক-আত্মা। ব্যাপারটা অনেকেই জানতেন। রবীন্দ্রনাথও। আমি অনেকদিন ধরেই দেহ নিয়ে ভাবনাচিন্তা করি। তবে সেটা কিন্তু ওই শারীরবিজ্ঞান বা ফিজ়িওলজি, সেটা নয়। যদিও নিউরো সায়েন্স অতি আকর্ষণীয় বিষয়। আমি একটু-আধটু পড়তে চেষ্টা করি- যথাসাধ্য।
প্র: আচ্ছা আপনার কথার সূত্র ধরে বলি, তালেবর কলেবরের দর্শনের বাঁধাধরা ছক থেকে বাইরে বেরিয়ে খটমট দর্শন ও গাণিতিক লজিকের ভিত্তিসূত্র ছেড়ে, এই যে আপনার যুক্তি-গবেষণা-কল্পনা-অনুভূতি চয়নবয়ন করে দর্শনচর্চা- এর প্রেরণা কোথায়?
উ: লোকে আর বলে কই সরল দর্শন! আমার লেখা পড়ে অনেক বলেন বড্ড খটমট! বড্ড শক্ত। তখন এসব শুনে আমার খুব দুঃখ হয়। কারণ, আমি কিন্তু খুব পরিশ্রম করি, বিষয়টাকে সহজ ও সরল করার জন্য। তা কিন্তু অন্যকে বোঝানোর জন্য সব সময় নয়, অনেক সময় নিজেরই বুঝতে সুবিধে হয়, যদি সহজভাবে লিখি বা বলি। যেমন বললাম, ত্বক নিয়ে আমার কাজের কথা। এটা করতে কিন্তু খাটতে হয়। কারণ, প্রথমেই কয়েকটা কোটেশন মাথায় আসে। ‘বড়লোকের ঢাক তৈরি গরিব লোকের চামড়ায়’ যদি এরকম মনে হয় যে, আমার ভাল লাগা, মন্দ লাগা এটা দিয়েই আমার আমি তৈরি। এটা তো সহজ কথা। বই পড়ে আমরা এই কথাটাই অনেক জটিল করে বলি। কোটেশন দিই। কোটেশন দিয়ে কিন্তু ফিলজ়ফি হয় না। তাহলে কী দিয়ে হয়? লজিক লাগে। আর লজিকের সঙ্গে সোজা জলের মতো অনুভূতিটাও লাগে। অনুভূতি কিন্তু সকলেরই আছে। এর জন্য কোথাও যোগের ক্লাস করতে হয় না। অনুভূতি সর্বক্ষণের। অম্বল যে হয়, তারও একটা অনুভূতি আছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে আমরা কোথাও একটা শিক্ষা পেয়েছি যে, অনুভূতি নিয়ে কথা বলতে নেই। বই পড়ে কথা বলতে হবে। বইটা ভাল করে পড়ে তা থেকে দারুণ-দারুণ কথা বলতে হবে। আরে, তার মানে এই নয় যে, সকলকে আত্মজীবনী লিখতে হবে। তাও আবার এভাবে যে, আজ সকালবেলা উঠে আমার খুব চোঁয়া ঢেকুর উঠছে। কিন্তু এর যেমন একটা যাকে জীবনানন্দ বলতেন টের পাওয়া, সেটা টের পাই তো আমরা একটা বোধ। যে-বোধ সব সময় আমাকে ঘিরে আছে। তো এটা একটা লজিক। আর্গুমেন্টেটিভ ফিলজ়ফি আর তাত্ত্বিকতা বলতে পারো তার মাঝামাঝি একটা জিনিস।
প্র: ‘দেহ গেহ বন্ধুত্ব’ লেখার সময় আপনার মনে নিশ্চয়ই এ ধরনের ভাবনাচিন্তা চলছিল?
উ: হঁ্যা। ঠিকই। কীরকম লাগছে এবং সেটা নিয়ে ভাবা। এর প্রথম কথা হচ্ছে, আমার কেমন লাগে? একা থাকা আর আর-একজনের সঙ্গে কথা বলা- আমার লাগাটা পাল্টে গেল তো? আমি নিজেই বুঝতে পারছি যে, একটা কিছু হল। আমার কিন্তু লাগাটা পাল্টাচ্ছে। কথা বলার সময় ঘড়ি দেখছি। এতক্ষণ আস্তে-আস্তে কথা বলছিলাম। এখন একটু দ্রুত বলছি, আমার লাগাটাও কিন্তু বদলে যাচ্ছে। এটাকে মাথায় রাখতে হবে। বাংলায় লাগা মানে ব্যথা লাগা ছাড়াও যে একটার সঙ্গে অন্য কিছুর সংস্পর্শ, সেটাও লাগা। পরশ বা স্পর্শ। তাহলে লাগাটা স্পর্শ থেকে তৈরি। আর স্পর্শ অনুভব করা যায় ত্বক দিয়ে। কিন্তু যে-দুটো জিনিস লেগে থাকে, সে দুটোর অন্য অংশে একটা বিচ্ছিন্নতাও থাকে। শুঁয়োপোকা শিউলিগাছে লেগে আছে। কিন্তু শিউলিগাছের অনেকখানির সঙ্গেও শুঁয়োপোকার কোনও সংযোগ নেই। যা কিছু লাগে বা লেগে থাকে, তা আবার নিশ্চয়ই না-ও লেগে থাকে। এবার সব লাগা নিয়ে আমি আমার সিদ্ধান্ত লিখতে পারি। আমি তোমার থেকে একটু বিচ্ছিন্ন না হয়ে তোমাকে ছুঁতেই পারি না। এই সিদ্ধান্তের মধ্যে একটা নতুনত্ব আছে বলে মনে হয়। কেউ এটা নিয়ে ভাববে না। সবাই বলবে এ আবার কী বাড়াবাড়ি কথা! আসলে কিন্তু ইন্দ্রিয়ের কথা তো বাদ যাচ্ছে না। কী প্রাচ্যে, কী পাশ্চাত্যে! যদি বলি ত্বক দিয়ে আমার ‘আমি’ তৈরি, তাহলে ভুল কোথায়? আমি ‘দেহ গেহ বন্ধুত্ব’ নিয়ে যখন কাজ করি, তখন তার মধ্যে এই ত্বকের কথা একটু-আধটু ছিল। এবং এটা কিন্তু তুমি যেটা দেখতে পাচ্ছ সেই চামড়ার বাইরের দিকের কথা নয়, চামড়ার ভিতরের দিকের কথা। এজন্য লেখাতে এটা সম্পূর্ণ বোঝানো যায় না। সামনা-সামনি কথাতে ভাল বোঝানো যায়। আমার চামড়ার ভিতরে এই যে এত কিছু, এটা একটা রহস্যও বটে। নিন্দুকের চোখ এড়িয়ে, সমালোচকদের দৃষ্টি এড়িয়ে, সমাজের অভিবাবকদের চোখ এড়িয়ে, একাকী নির্জনে গাছতলায় শান্ত পরিবেশে আমি তার হাতটা ধরলাম! আমার তো খুব ভাল লাগছে। কিন্তু আমার কৌতূহল, আমার পরশে তার কেমন লাগছে - সেটা জানার। সেটা কিন্তু কোনওদিনই জানতে পারব না। সব সময় আমার এদিক থেকে কীরকম লাগছে, সেটা কিন্তু জানা যায়, অন্যদিকেরটা নয়।
প্র: এই যে লাগার কথা বললেন, আবার লিখছেন মানে, আপনার আলোচনায় আছে, আয়রন আর আয়রনির আন্তঃসম্পর্ক। আপনি এথিক্স, পলিটিক্স, মেটাফিজিক্সের মাধ্যমে এই অন্তর্দৃষ্টির ব্যঞ্জনা করেছেন। এ করতে গিয়ে কখনও কি কোনও বিপরীত বা বিরুদ্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে?
উ: যথেষ্ট বিরুদ্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে। আরে, খণ্ডন করতে গেলে তো আগে পড়তে হবে। সজনীকান্ত দাস অন্তত জীবনানন্দের লেখা পড়তেন! এই যে আমি এত বাংলায় লিখছি, এর জন্য তো আমার কর্মক্ষেত্রে উন্নতি হবে না। কারণ, ওখানকার বায়োডেটায় তো আমি এসব উল্লেখ করলেও, কেউ বাংলা বুঝবে না। সংস্কৃতে পাশ্চাত্য এপিস্টিমোলজির বই লিখেছি শুনে মার্কিন, ইংরেজ দার্শনিকরা জোরে হেসে ওঠেন। যেন একটা মজার ব্যাপার! ভারতের প্রগতিশীল সোশ্যাল সায়েন্টিস্টরা ভাবেন, ‘এ শালা সংস্কৃতে লেখে, পেটে-পেটে বিজেপি’! কাজেই ইংরেজি সংবাদপত্রে আনন্দ পুরস্কারের রিপোর্ট প্রকাশিত হলেই একমাত্র আমি আমার বিভাগীয় প্রধানকে গিয়ে তা দেখাতে পারব। আমার স্ত্রী যখন আমার কোনও লেখা পড়ে বলেন, “না, কিস্যু হয়নি!” তখন আমার দুঃখ হয়, কিন্তু এর সঙ্গে আমি এটাও বুঝি যে, তিনি এটা বুঝেই বলছেন। কাজেই তুমি যদি বুঝে মত খণ্ডন করো, তাহলে তা আদতে উপকারেই আসে। তখন মনে হয়, দ্যাখো, ও তো আমাকে একটা ভুল থেকে বাঁচিয়ে দিল। কিন্তু না-বুঝে খণ্ডন করলে তখন ভাল লাগে না। আসলে আমরা মাস্টারমশাই তো, কাজেই ‘ও শ্যামাদাস’ মার্কা অ্যাটিটিউড সব সময় কাজ করে। আগে আমি কী দারুণ কথা বলছি, সেটা তো আগে বোঝো! অনেকে সেটা বোঝে আবার অনেকে বোঝে না, অনেকে আবার ফুকো, লাকাঁ, আগামবেন ঝেড়ে দেয়। আসলে এটাও ঠিক যে, তর্কের কচকচানির মধ্যেই কিন্তু ফিলজ়ফির মজা। আমি কিন্তু এটাই করার চেষ্টা করছি। যাকে কচকচি বলে, এই কচকচির মধ্যেও কিন্তু একটা রস আছে। সারাক্ষণ কি রোগীর পথ্য ভগবদ্গীতা মেড-ইজ়ির আলুসেদ্ধ খেলে চলে? মাঝে-মাঝে নব্যন্যায়ের সজনে ডাঁটা সাহিত্যের মধ্যেও আনা উচিত। বিনয় মজুমদার তো কবিতায় বীজগণিতও ঢুকিয়েছেন রসাস্বাদেরই জন্য! তা লোকে বুঝবে না, যতক্ষণ সে নিজে একজন খণ্ডনকারী বা প্রতিপক্ষ না-হবে। আমার মাস্টারমশাই ছিলেন স্যার পিটার স্ট্রসন। যিনি অল্প বয়সে রাসেলকে কচুকাটা করেছিলেন। তাঁর মূল মতকে খণ্ডন করে আমি একবার লন্ডনের কিংস কলেজে একটা প্রবন্ধ পাঠ করতে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। স্ট্রসনের তখন বয়স হয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ তখন স্ট্রসনকেও আমন্ত্রণ জানালেন। বললেন, অরিন্দম একঘণ্টা বলবেন তারপর আপনি আধঘণ্টা তার রেসপন্ড করবেন। তা স্ট্রসন আমাকে এত ভালবাসতেন, তিনি আগের দিন অক্সফোর্ডে আমাকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, এসো, আমার সঙ্গে লাঞ্চ করো। আর সেই সঙ্গে দেখে যাও, আমি আগামীকাল তোমার উত্তরে কী বলব! তো সেটা আমি দেখলাম। দেখে, সত্যি বলছি, একটু চুপসে গেলাম। আমি ওঁর অনেক কথাকে কেটেছি, তিনি তার এত সুন্দর জবাব দিয়েছেন যে, তিনিও বুঝলেন যে, আমার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল! তিনি বললেন, অরিন্দম ভয় পেয়ো না। আমার কথাই শেষকথা নয়। তুমিও এর জবাব দিতে পারো। তখন আমি বললাম, আমি কী বলব? আপনি এত সুন্দর উত্তর দিলেন। তখন তিনি বললেন, এটা আমার আর তোমার মধ্যে থাকুক। এর উত্তরে কী বলতে হবে, তা আমি তোমাকে শিখিয়ে দিচ্ছি। তখন তাঁর অত বয়স, কিন্তু সেই বয়সেও তিনি কী সুন্দরভাবে আমাকে এক কথাতেই বুঝিয়ে দিলেন। এর মানে, তাঁকে কী করে খণ্ডন করতে হয়, সেটা তিনি নিজেই জানেন!
প্র: এখানেই বোধহয় শিক্ষকের পূর্ণতা। শিষ্য যখন গুরু অথবা আচার্যকে ছাপিয়ে যাচ্ছে, সেটা তো আচার্যের পক্ষেও পরম তৃপ্তির একটা জায়গা। হৃদয়ের প্রসারতারও একটা বড় দিক এখানে উন্মোচিত।
উ: শুধু তাই নয়। এখানে হৃদয়ের সঙ্গে মস্তিষ্কও মিলেমিশে একাকার। মস্তিষ্ক ভাল না-হলে মাথায় একসঙ্গে এত কথা আসতে পারে না। আর হৃদয় ভাল না-হলে এসব কথা মনে চেপেই রেখে দিতে পারতেন। দুটোই দরকার। আবার একজন ভারতীয় মাস্টারমশাইও আছেন, তিনি আবার দুর্বল, নিজের ওপর তেমন কনফিডেন্স নেই। ইনি খুব ভিতু। ইনি নিজে যেটা লিখছেন, সেটা আমাকে কিছুতেই দেখাবেন না। আমি যদি ছেপে দিই- এই ভয়ে! এই হচ্ছে একেবারে উল্টোদিক।
প্র: কে তিনি?
উ: নামটা বলব না। তবে তিনি একজন ভারতীয় অধ্যাপক। এখন আমেরিকায় থাকেন। কিন্তু তিনি এই রকম। আমি বললুম, কেন স্যার? এখনও এত ইনসিকিয়োরিটি? আমার যেমন, আমি যেমন কোনও একটা কথা মাথায় এল, ভাবি বয়স হচ্ছে, কখন লিখব কোথায় লিখব, তাই আগেই দু’-একজন ছাত্রকে ডেকে তাদের ব্যাপারটাকে বুঝিয়ে বলে দিই। আমার বহু ছাত্রছাত্রীরাই তো এখানকার ও আমেরিকা-কানাডার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলজ়ফি পড়ায়। কিন্তু এখন তো ফিলজ়ফি ভাল ছেলেমেয়েরা সেভাবে পড়তে আসছে না। লোকে বলে ফিলজ়ফি পড়ে টাকা করা যায় না। অথচ ভারতেই তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে দর্শনের অধ্যাপকরা গাড়িবাড়ি কিনে ফেলছেন। ভারতীয়রা এবং এনআরআই-রা অবশ্য এখনও ছেলেমেয়েকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়র করতেই উত্‌সাহী।
প্র: আপনি স্যার পিটার স্ট্রসনের কথা বললেন। আপনার আর-এক শিক্ষক ও দিকপাল দার্শনিক অধ্যাপক বিমলকৃষ্ণ মতিলালের সান্নিধ্যলাভের প্রসঙ্গে কিছু বলবেন?
উ: বিমলবাবুকে বোঝানো বড় শক্ত। বিমলবাবু এত মৃদুভাষী। অথচ লেখার মধ্যে এত ধার! এত স্পষ্টতা! এটাই আমি সারা জীবন ধরে শেখার চেষ্টা করেছি। আর-একজনের কথা বলব আমার ওয়ের্স্টান ফিলজ়ফির গুরু, প্রণবকুমার সেন। যাদবপুরের ফিলজ়ফির অধ্যাপক ছিলেন। ইউজিসি-র সদস্যও ছিলেন। প্রণবকুমার সেন ছিলেন স্পষ্টতার এক প্রতিমূর্তি। অস্পষ্ট কোনও কিছু পছন্দ করতেন না। এবং এখন আমি এত সব নিয়ে লিখছি দেখলে তিনি খুব-একটা খুশি হতেন না। আমাকে স্ট্রসনের কাছে পড়তে তিনিই পাঠিয়েছিলেন। বিমলবাবুও একই রকম। আমি তখন বিমলবাবুর কাছে পড়তে চেয়েছিলাম। ওখানে আমার কাজ ভারতীয় দর্শনের ওপর ছিল না। ওখানকার কাজ ছিল ওয়েস্টার্ন ফিলজ়ফি অফ ল্যাঙ্গোয়েজের ওপর। ভাষাদর্শনের ওপর। যার কথা আমি খুব-একটুখানি ‘তিন কাল’-এ লিখেছি। তা বিমলবাবু বললেন, আমি যাঁর কাছে শিখেছি, তুমি তাঁর কাছে যাবে। বিশ্ববন্ধু তর্কতীর্থের কাছে পড়ার সুযোগ ঘটল। আমি যে সংস্কৃতে ওয়েস্টার্ন এপিস্টিমোলজির ওপর একটা বই লিখেছি, সেই বইটা তাঁকে উত্‌সর্গ করেছি। খুবই খারাপ লাগে ভাবতে, যেদিন সকালে ওঁর হাতে দিতে গেলাম, সেদিন সকালেই পণ্ডিতমশাই মারা গিয়েছিলেন। অগাধ পাণ্ডিত্য আর অবিশ্বাস্য নিরভিমানতার এমন সমন্বয় কোথাও দেখিনি। বিমলবাবুর সঙ্গে ছিলাম প্রথম দুটো বছর। প্রতিদিন সন্ধেবেলা ওঁর বাড়িতে যেতাম। শুনতে চাইতেন চারদিকে কী হচ্ছে। আমার সঙ্গে অনেক কথা বলতেন। অনেক বই ওঁর কাছে পড়েছি। কিন্তু ওঁর বিদ্যোত্‌সাহের ওই ব্যাপ্তিটা, খালি ওই ন্যায়শাস্ত্র পড়লে চলবে না। সবক’টা দর্শন পড়তে হবে, বিশেষত জৈন আর বৌদ্ধদর্শন পড়তে হবে একথা বলতেন বিমলবাবু। তাঁর আর-এক ছাত্রের নামও এই প্রসঙ্গে করতে হয় প্রবালকুমার সেন। যিনি আমার ‘ভাতকাপড়ের ভাবনা’র দ্বিতীয় সংস্করণটি ভাল করে দেখে দিয়েছেন। এঁরা আমাকে বৌদ্ধদর্শন শিখিয়েছেন। তবে শিখিয়েছেন মানেই যে আমি শিখেছি, তা নয়। কিন্তু এঁরা চেষ্টা করেছেন, যত দূর সম্ভব। বিমলাবুর কাছ থেকে যেটা আমি শিখতে পারিনি, তা হল নম্রতা। নিরহঙ্কার এক মানুষ। ওই রকম নিরহঙ্কার মানুষ আমি দেখিনি। ওঁর সাহচর্য ও সান্নিধ্য লাভ প্রচুর করেছি। আর স্নেহও প্রচুর পেয়েছি। গানের প্রতি দুর্বলতা ছিল। আমি একটা গান গাইতাম। সেটা আবার ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে আমার জ্যাঠামশাই শিখেছিলেন। শুনেছি তুলসীদাসজির লেখা গান। সেটা হচ্ছে দ্রৌপদী গাইছেন, ‘বিন কাজ আজ মহারাজ লাজ গঈ মেরি।’ সেই গানটা বিমলবাবুর খুব প্রিয় ছিল। যখন বিমলবাবু মারা গেলেন, তখন এই গানটার কথা আমি ‘দেশ’ পত্রিকায় লিখেছিলাম। তিনি এই গানটা শুনতেন আর আক্ষরিক অর্থে অশ্রুপাত করতেন। এরপর তিনি মহাভারত নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। এটা আমি বলতে পারি যে, আমার গান থেকেই তিনি মহাভারত নিয়ে কাজ করার প্রেরণা পেয়েছিলেন।
প্র: খ্যাতনামা শিক্ষকদের আপনি নিবিড় সান্নিধ্য লাভ করেছেন। এর মধ্যে কখনও কি মনে হয়েছে নিজেই নিজেকে কতটা শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে পেরেছেন?
উ: হিউম্যানিটিজ়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল নিজেকে জানা। নিজেকে জানার জন্য আমাদের সকলকে পড়তে হবে। দুই অর্থেই পড়তে হবে। কেবল ওপরে ওঠবার চেষ্টা করলে নিজেকে জানা যায় না। মনে রাখতে হবে, স্বার্থপরতা এখন একটা কাল্ট হয়ে গিয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে সেই দুর্বলতা। নিজেকে না-জানা। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ভাবনাটাই দর্শন। নিজেকে বারবার পড়ে গিয়ে, গড়ে-পিটে, শিক্ষিত করে না-তুলতে পারলে লাভ কী? এবং তার মধ্যে যদি আমি ঈশ্বরের প্রসঙ্গ তুলি, তাহলে ঈশ্বর মানে না যারা (বৌদ্ধরা) তারা সেই মত খণ্ডন করেছে। শুধু বৌদ্ধ কেন, ভারতীয় দর্শনের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি অর্থডক্স অর্থাত্‌, বৈদিক, মীমাংসক তাঁরাই সর্বত্র ঈশ্বর খণ্ডন করেছেন। অবশ্য মহানৈয়ায়িক উদয়নাচার্য ঈশ্বরের থাকা নিয়ে যে-প্রমাণ দিয়েছেন, যে-যুক্তি দিয়েছেন, তা তো অনবদ্য। ঈশ্বর যদি কেউ থাকেন, তাহলে তিনি আমাদের ভাল চাইবেন। বলা হয়েছে, ঈশ্বর মঙ্গলকামী। তাহলে এই যে লক্ষ-লক্ষ, কোটি-কোটি মানুষ যুদ্ধে মরছে, না-খেতে পেয়ে মরছে এটা কী করে হয়? এসব নিয়ে বৌদ্ধ দার্শনিকরা অনেক কিছু বলেছেন। এ নিয়ে ধর্মগুরুরা কী বলছেন? ঈশ্বরের লীলা! সংস্কৃতে কথা আছে, একজনের রোগ-জরা-দুঃখ-কষ্ট-মৃত্যু আর-একজনের যদি লীলা হয়, তাহলে সেই রকম ঈশ্বরকে ভজনা করে লাভ কী? এসব সংস্কৃতে শ্লোকের আকারে আছে। তুমি মার্কসের মধ্যে তত নাস্তিকতা পাবে না, যতটা তুমি সংস্কৃতে পাবে। এসব জানা দরকার। সেসব জেনে তারপর আস্তিক হও। বন্ধুবর শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়- আস্তিক কাকে বলে? কাকে বলে নাস্তিক? এ নিয়ে চমত্‌কার প্রবন্ধ লিখেছেন। পড়ে দেখো। আমি তো ঈশ্বর মানি। কিন্তু আমি এসবও জানি। ফলে আজ যদি একজন নিরীশ্বরবাদী কেউ আমার সামনে আসেন, আমার তাঁকে দেখে ভয় করে না। একবারও মনে হয় না দারোয়ান দিয়ে তাঁকে তাড়িয়ে দিই। আমি বরং তাঁকে ওয়েলকাম করি। তার কারণ, আমি তাঁদের দিকের যুক্তিটাও জানি। আমার বিশ্বাস হারাবার ভয় নেই। আমি আরও শুনতে চাই। এটা কিন্তু গাঁধীজিরও মত ছিল। নিজের মাস্টারি নিজে করতে গেলে অন্যদের, বিশেষত যারা আমাকে অপছন্দ করে, তাদের মাস্টার বলে মানতে হয়।
প্র: গাঁধীজির ধর্মবিশ্বাসে জৈন প্রভাব ছিল বলে শোনা যায়?
উ: হ্যাঁ। তবে মূলত তিনি রামনাম করতেন। খুূব সাধারণ হিন্দুর জীবনযাপন করতেন। কেবল অস্পৃশ্যতা বর্জনটুকু আধুনিক। সবসময় ধর্ম করলে ক্ষতি নেই, কিন্তু সব কিছু ওপেন টু ডিবেট হওয়া চাই। এমন কিছু থাকবে না, যেটাকে তুমি ডিবেট করতে পারবে না। সব বিন্দুতে তর্ক করতে হবে। একেই বলে, দ্যাখো, কথাটা তোমার নাকের ডগায় রয়েছে, তুমি দেখতে পাচ্ছ না। একেই বলে সতর্কতা! সতর্ক মানে কী? তর্কে থাকা। তর্কের সহিত থাকা। তাই না? সবান্ধব আপনারা বিয়েতে আসবেন বলি না! মানে, বান্ধবদের নিয়ে আসবেন। সতর্ক থাকার মানে কী? তর্কের সঙ্গে থাকবে সব সময়। তর্ক বাদ দিয়ে থাকবে না। কিন্তু ধার্মিকরা, ব্যবসায়ীরা, বিজ্ঞাপনদাতারা, কবিরা সকলে বলছেন তর্ক কোরো না। তর্কে বহু দূর! জাস্ট এনজয় করো। মদ খাও অথবা শ্রীশ্রীঅমুকশংকরকে বিশ্বাস করো- অথবা দুটোই করো। সবাই তর্কের বিরোধী। তর্কের আর-এক নাম ফিলজ়ফি। কার্যকারণ সম্পর্কের কথা অনেকে বলে থাকেন। বলেন, এসব নিয়ে ভাবলে নাকি দুঃখ হয়! আরে, কারণ জানতে চাইবে না মানুষ?
প্র: মানে, আপনি বলছেন যুক্তিরহিত হয়ে থাকা কাজের কথা নয়। তাহলে যদি বলি যুক্তির কারণ খোঁজা মানে তো সেই যুক্তিই খোঁজা?
উ: হঁ্যা, ঠিক তাই। তুমি কেন এটা করবে। ধরো, আমাকে একটা কর্তৃপক্ষ ছাঁটাই করল। ছাঁটাইয়ের কারণ, পাঁচজন শ্রমিকের মধ্যে ডাউনসাইজ় করবে বলে তিনজনকে রাখবে, আর বাকি দু’জনকে বাদ দেবে। আমি ইউনিয়নকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন ছাড়াবে? তার উত্তরে যদি মালিক বলেন যে, আমার ইচ্ছে হয়েছে, সেই জন্য! তাহলে সেই সমাজের কি বেঁচে থাকা উচিত? সেখানে যদি কেউ বলেন, কেউ কারণ জানতে চেয়ো না। আমার মনে আনন্দ হয়েছে, তাই আমি কয়েকজনকে ছাঁটাই করলুম! মরি মরি, আহা কী উত্তর! তো সেইজন্যই বলছি, ফিলজ়ফির উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রত্যেককে তর্ক করতে শেখানো। যত তর্ক করবে, তত ভাল। আমাকে তো যুক্তিপূর্ণ থাকতে হবে।
প্র: কার সঙ্গে তর্ক জুড়ব?
উ: নিজের সঙ্গে। তর্ক করে নিজেকে হারাতে হয়। হারানো দু’অর্থে। কথাটা এক্ষুনি বুঝলাম। আমি একজনকে বললাম, ড্রয়িং মানে আঁকা আবার আকর্ষণ করাও তো বটে। ড্র অ্যাটেনশন। তো ফাঁকা ক্যানভাসে তাকালে ইউ ক্যান ড্র আউট। মিকেলাঞ্জেলোর গল্প আছে। একটা বাঁকাচোরা পাথর পড়ে আছে। পঞ্চাশ বছর ধরে সেটা কেউ টাচ করেনি। তিনি সেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ওর ভিতরে যা আছে, আমি তা বের করে আনব। তো ভাল শিল্পী হচ্ছেন তিনি, যিনি ড্র আউট করেন। যিনি বের করে আনতে পারেন। এরকম নিজেকে ‘হারাতে’ হবে। মানে, নিজেকে তর্কে পরাজিত করতে হবে। তার মানে নিজের অহংটাকে হারিয়ে ফেলতে হবে। এটা অবশ্য আবার একটু আধ্যাত্মিকতার মতো শোনাচ্ছে।
প্র: আপনি দার্শনিক, আপনিই ভাল বলতে পারবেন, দর্শনচর্চায় আবেগের গুরুত্ব কতটা?
উ: ফিলজ়ফি করতে গেলে কয়েকটা ফান্ডামেন্টাল এথিক্স প্রয়োজন। জ্ঞানতত্ত্ব কাকে বলে, এটা প্রথমে জানতে হবে। আমার এই কথাটা শুনে খুব রাগ হচ্ছে বলেই এটা অপ্রমাণ এই ভাবালুতা চলবে না। এসব বেসিক আলোচনা। আবেগের বিষয়ে দর্শন। দার্শনিক যুক্তির মধ্যে আবেগকে না আনাই ভাল। কিন্তু সেটাও একটু সূক্ষ্মভাবে বুঝতে হবে। তার মানে আবার এই নয় যে, দর্শনের ক্লাসে আসার আগে চৌকাঠে সব আবেগ ফেলে আসতে হবে। আবেগ-সহ সম্পূর্ণ মানুষটাই সেখানে আসবে। কিন্তু প্রতিক্ষেত্রে যেমন, ভাবা নিয়ে ভাবা, কথা নিয়ে ভাবা। আমি তো বলছি না যে, তোমরা দর্শন করলে ভাল পোশাক পরতে পারবে না। কিন্তু পোশাকটা যে পরে আছ, সেটা নিয়েও ভাবতে হবে। কেন আদৌ মানুষ পোশাক পরে? এক শীতের দেশেও কী করে মহিলাদের হাত-পা বের করা জামাকাপড় এত জনপ্রিয়, আর ভ্যাপসা গরম দেশেও, ইংরেজ চলে যাওয়ার ষাট-সত্তর বছর পরেও তিন প্রস্থ স্যুট আর গলায় দাসত্বের টাই পরে ঘামতে থাকাটাই সভ্যতা হয়ে দাঁড়াল? কেন ভাবছি? ফিলজ়ফি করে তাহলে লাভ কী? কী লাভ- এই প্রশ্নটা করেই বা কী লাভ? ঠিক সেই রকম। আমার খুব রাগ হচ্ছে। আমার মনটা ছটফট করছে। অধৈর্য লাগছে। দর্শন করার সময় ছটফট করার মানে কী? রাগ মানে কী? রাগ কেন হয়? এসব নিয়ে ভাবা। এই ভাবার ফলে আবেগ চলে যায় না, কিন্তু আবেগের ফলে মানুষ যে অসতর্ক কাজ করে, তা কমে যায়। এর একটা সাক্ষাত্‌ উপকারও আছে। আমি তো মনে করি, আবেগে সংযমের প্রয়োজন হয়। তার মানে আবেগের দিকে একটু আলাদা করে তাকাতে পারা।
একজন শোকার্ত হয়ে পড়েছে। সেই শোক থেকে সে বাল্মীকির মতো শ্লোক লিখতে পারবে বলে মনে হয় না। কিন্তু সে যদি শোকের দিকে তাকিয়ে ভাবে যে, আরে, এটা আমার কী হচ্ছে? দুটো পাখির মধ্যে একটা পাখিকে ব্যাধ মেরে ফেলেছে, তাতে এত কষ্ট হচ্ছে কেন? এই সময় দর্শনটা হয়। কিন্তু তাতে যদি আবেগই না-থাকে, তাহলে থাকবেটা কী? ইমোশন ছাড়া এটা হবে কী করে? শুকনো জায়গায় হাইড্রো-ইলেকট্রিক পাওয়ার হবে কী করে? প্রচুর জল থাকবে, সেই জলকে বাধা দেওয়া হবে, তবে না ইলেকট্রিসিটি হবে। আবেগ আর দর্শনও ঠিক তাই। সুতরাং, আবেগ আছে এবং তাকে বাধা দিতে হবে। বাধা মানে অবদমন নয়। অবাধ আবেগে না-থাকে সৌন্দর্য, না-থাকে ন্যায়।
রাগ বা ক্রোধ এখনকার দিনের সবচেয়ে বড় আবেগ। যার তলায়-তলায় থাকে বহু বাসনায় প্রাণপণে চাওয়া। গ্রীষ্মকালে গলদঘর্ম ট্র্যাফিক, ভিড়ে ঠাসা বাসে কেউ একজন পা মাড়িয়ে দিল। অমনি রক্তচক্ষু! অন্যদিক থেকে সরি! এবার সে ভাবছে, পা মাড়িয়ে আবার সরি বলছে! এখন এই রাগটার দিকে লোকটা যদি নিজে তাকাতে পারে! আমার দীক্ষাগুরু বলতেন, রাগের সবচেয়ে বড় ওষুধ হল আয়না! রাগ যখন হয়, নিজেকে আয়নায় দেখতে হয়। তখন হাসি পাবে।
প্র: মানে নিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন? আপনি কি নিয়ন্ত্রণবাদী? কারণ, এর আগেও আপনি উন্মুক্ত বাজার নীতির বিরুদ্ধে মত দিয়েছেন। তাহলে কি ধরে নেওয়া যায়, অর্থনীতিতেও আপনি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে? আপনি কি সমাজতান্ত্রিক?
উ: এটা ভাল প্রশ্ন। আমি তো অর্থনীতিবিদ নই, কিন্তু তা-ও দর্শন পড়াতে গিয়ে ‘ক্যাপিটাল’-এর প্রথম একশো পৃষ্ঠা আমি অত্যন্ত যত্ন নিয়ে পড়াই। নিজেও পড়ি। ডেভিড হার্ভে বলে একজন একখানি বই লিখেছেন, ‘সেভেনটিন কনট্রাডিকশনস অফ ক্যাপিটালিজ়ম’ নামে। বইটা সবে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে এসব নিয়ে অনেক কথা বলা আছে। হ্যাঁ, আমি সমাজতন্ত্রী। তবে এখন সমাজতন্ত্র বলতে যদি কেউ সোভিয়েত রাশিয়া বলে, তাহলে আমি নেই।
প্র: সে তো স্বামী বিবেকানন্দও নিজেকে সমাজতন্ত্রী বলে গিয়েছেন...
উ: মানে, ক্যাপিটালিজ়মের বিরোধী। কিন্তু যদি এমনটা হয় ক্যাপিটালিজ়মের মাধ্যমে যাওয়া ছাড়া কোনও সমাজের পক্ষে উপায়ই নেই। কিন্তু সেটা তো হতেই হয়। যেমন চিনে করা হচ্ছে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে, ক্যাপিটালিজ়ম নিজেই নিজেকে ধ্বংস করে। আমার কথাটা খুব সহজ। এতটা একস্ট্রিম বৈষম্য, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে এতটা তফাত অর্থাত্‌, বিপিএল সীমা, দারিদ্র-সীমার নিচে থাকার জন্য মাপকাঠি করা হচ্ছে দৈনিক বত্রিশ টাকার মজুরি! আমি এটা নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম। দু’বছর বা একবছর ধরে ইউপিএ আমলে তদানীন্তন যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান মন্টেক সিংহ অহলুওয়ালিয়াকে সরকার ভার দিয়েছিল দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারীদের কত টাকার দৈনিক রোজগারের মাপকাঠিতে নিধার্রণ করা হবে, তা দেখার। শহরে যা ছিল, তিনি তা কমিয়ে দিলেন। নামিয়ে দিলেন। অথচ ওঠানোর কথা। কী দাম জিনিসপত্রের! আলুর দাম বেড়ে গিয়েছে। এখন দৈনিক আয় যার বত্রিশ টাকা, সে খেতে পায় না। করা উচিত ছিল অন্তত ষাট টাকা। ডাল তো গরিব লোক খেতেই পারে না। এ তো সবাই জানি। আর কী খাবে লোকে? মাঝে-মাঝেই উত্তর ভারতে পেঁয়াজের সমস্যা হয়। তা তিনি এটা ঠিক করলেন এবং বললেন, যার ছত্রিশ টাকার চেয়ে বেশি রোজগার, তাকে আর দরিদ্র বলা যাবে না! হল তো? তো তাঁর এই গবেষণা করার জন্য মাসের পর মাস প্রতিদিন ভ্রমণের বিল হয়েছে পঞ্চাশ না ষাট হাজার টাকা করে! প্রতিদিন খেতে নয়, পরতে নয়, শুধু ঘুরতে পঞ্চাশ হাজার টাকা লাগে? আর আমি প্রতিদিন পঞ্চাশ হাজার টাকায় ঘুরে ঠিক করে দিলাম যে, বত্রিশ টাকাই যথেষ্ট! তা এটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে কি তোমাকে সোশ্যালিস্ট হতে হবে নাকি? এই ভয়ংকর অমানবিকতার যাঁরা প্রতিবাদ করেন না, তাঁরা কী ধরনের ইকনমিস্ট? তাঁরা মানুষ কি না আমি জানি না। এটার প্রতিবাদ তো আমি করেছি। আর তো কিছু বলছি না। আর-একদল বলছেন, না, এই রকমই করতে হয়। চুইঁয়ে পড়ার অর্থনীতি করতে গেলে এরকম করতে হয়। কী চুঁইয়ে পড়ল? ধনী লোকের কাছ থেকে? আমার একটা লোভ চুইঁয়ে পড়ল। বাব্বা! আমার কবে ওঁর মতো অমন বড় একটা ফ্ল্যাট হবে! হবে না কোনওদিন। হতে পারে না। এত জনসংখ্যা যেখানে। এর উত্তরে আবার কী বলা হল? না, জনসংখ্যা এবার একটু কমানো দরকার। তা, এখন তো বাচ্চাকাচ্চা হওয়ার গড়পরতা হার কমে গিয়েছে, কতজনের কী হচ্ছে তাতে? সমস্যা কিছু কমেছে? কিন্তু কোনও পাঁচতারা হোটেলে এক কাপ কফির দাম যদি পাঁচশো টাকা হয়, তাহলে কী করা যাবে? উত্তর হচ্ছে সেই, তা করার চেষ্টা করতে হবে! আসলে তা নয়। এত উত্‌কট অসাম্য চলতে পারে না বেশিদিন।
প্র: কিন্তু সমাজতন্ত্র কি মানুষের সব দুঃখমোচন করতে পারে?
উ: না। কোনও তন্ত্রই তা পারে না। ‘টাংকি সাফ’ গল্পে শীর্ষেন্দুদা [মুখোপাধ্যায়] বলেছেন, ‘কুছু গার্দা থেকেই যাবে’। তবে সমাজতন্ত্রের দিকে ঝোঁক মন্দের ভাল। পুঁজিতন্ত্রের মতো উন্নয়নের নামে নির্লজ্জ নিষ্ঠুরতার রমরমা নয়। আসলে দার্শনিকদের উচিত, ব্যাখ্যা বা বদলের আগে সম্পদের মালিকানা বা স্বত্ব-স্বামিত্বের সম্বন্ধটাকে একেবারে নতুন করে ভাবা। এটা ‘অমুকের একার সম্পত্তি’ এই কথাটাই ধোপে টেকে না। জমিদার রবীন্দ্রনাথ ‘দুই বিঘা জমি’তে এই নিয়ে কড়া আত্মসমালোচনা করেছেন।
প্র: রবীন্দ্রনাথ আপনার জীবনের অনেকখানি জুড়ে আছেন বোঝা যায়। কতটা?
উ: গানের দিক দিয়ে সবটা। যুক্তি, বুদ্ধি, এস্থেটিক সেন্সিবিলিটির দিক দিয়ে একেবারেই নয়। সে ব্যাপারে হ্বিটগেনস্টাইন আমার আদর্শ বলতে পার। তবে কিনা তিনি মানে, ল্যুডহ্বিগ বড্ড খ্যাপাটে, আর হৃদয়হীন।
প্র: আপনি কাদের জন্য লেখেন? পাঠকের জন্য, নাকি লেখকের জন্য?
উ: অবশ্যই পাঠকদের জন্য। অপাঠকের জন্য কেউ লেখে নাকি- যেন বধিরদের জন্য গান করা! বাংলা লিখি, সত্যি বলতে চার-পাঁচজন পাঠকের কথা মাথায় রেখে। স্বর্গত বিমল মতিলালের কেমন লাগত? সুদীপ্ত কবিরাজ, শঙ্খ ঘোষ, গায়ত্রী স্পিভাক, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় এঁদের পড়ে কেমন লাগবে, তা ভাবি। বাকি সবটাই নিজের জন্য লেখা।
আত্মোদ্দিষ্ট চিন্তার কাচাকাচি- বোঝাকে সাফ করার চেষ্টা। ইংরেজি লেখার সময়ে ভাবি স্বর্গত পিটার স্ট্রসন তথা মাইকেল ডামেটের কেমন লাগত। আর আমার ফিলজ়ফির কড়াতম পরীক্ষক বৃন্দা ডালমিয়ার কেমন লাগবে, তা প্রায় প্রত্যেক ইংরেজি বাক্য লিখতে গেলে ভাবি।
প্র: ঔচিত্যবিচারচর্চা অবচেতনে আমাদের ভাবায় বইকী, কিন্তু বহিঃপ্রকাশে মানে চিন্তায়-কাজে তেমন প্রতিফলিত হয় কি? আপনার লেখার সূত্র ধরেই বলি, এখানে দর্শনের সঙ্গে মনস্তত্ত্বের সংযোগের বিষয় কতখানি প্রাসঙ্গিক?
উ: তোমার এই প্রশ্নটা যেমন গম্ভীর এবং জরুরি, তেমনই জটিল। আমরা বস্তুত কেমন করে ভাবি, কষ্ট পাই, স্বপ্ন দেখি, কামনা করি, পস্তাই, আশা করি এসব বর্ণনা করা মনোবিজ্ঞানের কাজ। দর্শনের কাজ নয়। কিন্তু দর্শনের শাখাগুলির মধ্যে একুশ শতকের শুরুতে, এই দেড় দশকে, ‘মনের দর্শন’ই সবচেয়ে সক্রিয়, সজীব।
আবার ভালমন্দ, উচিত-অনুচিত বিচারের শাখা যে এথিক্স- তারও মূল বিষয় হল মানুষের কাজকর্মের পিছনে যে-অভিপ্রায়, কামনা, ভবিষ্যত্‌ বিষয়ে প্রত্যাশা, অতীত বিষয়ে অনুতাপ, অন্যের ওপর আকর্ষণ-বিকর্ষণ এসবের মূল্যায়ন। তাই মনোবিজ্ঞানের শিক্ষা বা আবিষ্কারগুলিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের সুখদুঃখ ইচ্ছা-প্রযত্ন-অনুরাগ-বিদ্বেষ-গর্ব-ভয়-ঈর্ষা ইত্যাদির নৈতিক বিচার দার্শনিকের অবশ্যকর্তব্য বলে আমি মনে করি। অবশ্যই নিজের সংশোধনের জন্য, পরের ওপর খবরদারি করার জন্য নয়।
প্র: আপনি বলছেন, বিশুদ্ধ ধার্মিক চৈতন্যের কথা, যেখানে থাকার নাম পারমার্থিক সত্তা। এই সত্তা সবচেয়ে পরের থাক। একটা কথা, বিচারবুদ্ধির সঙ্গে দর্শনের বহু জায়গায় সখ্য আবার বহু জায়গায় বিরোধ। এই যেমন আপনি বলছেন, তর্ক করতে, ভাবতে কিন্তু একটা কথা, ভেবে, তর্ক করে আমাদের মধ্যে সহনশীলতা কি আসা সম্ভব?
উ: কিছু মনে কোরো না- এই প্রশ্নটা তোমার রীতিমতো হিজিবিজি কনফিউজ্ড। থাকা মানে পারমার্থিক সত্তা না ব্যবহারিক সত্তা, এটা একটা অদ্বৈত বেদান্তের টেকনিক্যাল সওয়াল। আর তর্ক করে ভাবলে সহনশীলতা আসবে কি না, তা একদম আলাদা একটা এডুকেশনাল সাইকোলজির প্রশ্ন। এরকম ‘মিশেল’ প্রশ্নের উত্তর না-দেওয়াই ভাল। একটু ফাজলামি করি? আমি তো আর মিশেল ফুকো নই যে, ওই রকম প্রশ্নের উত্তর দেব!
প্র: সমাজ এবং জাতীয় জীবনে সহনশীলতার ক্ষেত্রটিই (ফ্রম অ্যাকসেপটেন্স টু টলারেন্স) তো তৈরি হচ্ছে না। অ্যাকসেপটেন্সের জায়গাই কি তৈরি হতে পেরেছে? টলারেন্স তো অনেক দূরের ব্যাপার। তাই এত গোলযোগ। আপনি কী মনে করেন?
উ: টলারেন্স বিষয়ে গত তিন-চার বছর ধরে তলিয়ে ভাবছি। আগে আমার কাছে কঠিনতম সমস্যা ছিল, ইনটলারেন্ট লোকেদের প্রতি ইনটলারেন্ট হব না টলারেন্ট হব? আমি পরমতসহিষ্ণু বলে যদি এই মৌলবাদীদের সভায় ডেকে সম্মান দিই, তাহলে তো এরা তর্কবিতর্ক করবে না ঝগড়া করবে। এখন আমি আরও জোর দিয়ে বলতে পারি, খোলা বিতর্কের দ্বারা এবং বাদবিচার সভায় নির্ভয়ে নিজপক্ষের সমালোচনা শুনে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করার মাধ্যমে যতটা সহিষ্ণুতা আসে, কেবল বিবেকানন্দ আউড়ে বা মাল্টিকালচারালিজ়মের মৌখিক ভদ্রতার কেতা শিখে ততটা আসে না। আর পরধর্মবিদ্বেষ সব ধর্মেই মহাপাপ। অভিনবগুপ্ত গীতাভাষ্যে বলেছেন, যারা ইষ্টনিষ্ঠার নামে অন্য দেবতাভক্তকে বিদ্বেষ করে, তাদের সঙ্গে কথা বললেও মন নোংরা হয়।
প্র: মনের মিলের অভাব। কিন্তু মেলানোর কাজটা তো করতে হবে? আমরা তো শুনে এসেছি মেলাবেন তিনি মেলাবেন? কিন্তু সত্যিই কি তাই?
উ: অমিল ঘটাবেন, বৈচিত্র আনবেন, শতচ্ছিদ্র করে জীবনবাঁশি বাজাবেন বলেই তো জগত্‌নাটকের নাট্যকার এই ঝগড়ুটে জগত্‌ বানিয়েছেন। কিছুদিনের জন্য ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে ভাঙা দরজার মিল ঘটালেও সব মিলনের শেষ হবে বিচ্ছেদে, সব উত্থানের শেষ পতনে, সব জীবনের শেষ মৃত্যুতে এ কথা তো মহাভারতের একাধিক জায়গায় রয়েছে। এই সব ঘরভেদী জটিলা-কুটিলার মধ্যেও অল্পদিনের মনের মিল করতে গেলে নিজেকেই দু’-চার ভাগে ভাগ করে নেওয়া ভাল। অরিন্দম এক নম্বরের আত্মম্ভরিতা বা ধৃষ্টতা বা বাচালতা নিয়ে যদি প্রতিদ্বন্দ্বী শত্রুপক্ষকে গালাগালি দেয়, তাহলে অরিন্দম দুই নম্বর সহানুভূতির সঙ্গে ওই শত্রুপক্ষের মনের ভাব বুঝে নিয়ে অমিলেও মিল খুঁজে পেতে পারে।
আত্মৈব হি আত্মনো বন্ধুঃ, আত্মৈব রিপুরাত্মনঃ। রাম, রাবণ, লক্ষ্মণ, হনুমান, সীতা, মেঘনাদ সব নিজের ভেতরেই খুঁজে গেলে, ব্যস- পরকে আর ততটা অচেনা পর মনে হয় না।
প্র: নব্যন্যায় তো এক সময় এই বাংলা থেকে বিকশিত হয়েছে। সমগ্র বিশ্বের কাছে বাংলার এই নব্যন্যায় সমাদৃত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে বাঙালি সেই নব্যন্যায়কে আপন করে নিতে শিখল না কেন?
উ: কতকটা বাঙালি ‘বাণিজ্যেতে যাবই’ বলে একটু নেচে উঠল। কতকটা বিদ্যাসাগর মশাই ন্যায়ের ওপর চটা ছিলেন বলে অবহেলা করতে শিখল। আবার ক্ষীয়মাণ হলেও ফণিভূষণ তর্কবাগীশ, মধুসূদন ন্যায়াচার্য, অনন্ত তর্কতীর্থ, বিশ্ববন্ধু তর্কতীর্থ, শ্রীমোহন তর্কতীর্থ, দামোদর আশ্রম প্রমুখ দিকপাল নৈয়ায়িক তো বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত কাজ করেও গেলেন। তবে এই মুহূর্তে দক্ষিণে শৃঙ্গেরী, তিরুপতি ইত্যাদি স্থানে গিয়ে বাঙালি পণ্ডিতদের নব্যন্যায় বিশেষত ‘গাদাধরী’ পড়ে আসা উচিত। সংস্কৃত এবং ইংরেজি দুই ভাষাতেই মূল গ্রন্থগুলি অবশ্যপাঠ্য না-হলে বাঙালির দর্শনচর্চা দিনদিন ওপরভাষা বাতেলাতে পরিণত হবে।
প্র: আপনি এক মহাপড়ুয়া। কাব্যপ্রেমীও। পাঠকসত্তার সঙ্গে লেখকসত্তার অনুষঙ্গটিও বিচিত্রধর্মী। গদ্য লেখেন, কবিতাও। শব্দচয়নও অনবদ্য। যেমন অহংফোন, অহংপ্যাড। এটা কি সচেতনভাবে করেন নাকি লিখতে গেলে আপনিই চলে আসে? নাকি এরও তাহলে একটা স্থিতিস্থাপকতা আছে?
উ: ওটা খানিকটা গুরুমারা বিদ্যা। আমার ঠাকুর মাসের পর মাস মৌন থাকতেন, সেটা তো শিখিনি। কিন্তু কথা নিয়ে মজা করতেন। সভার মধ্যে লোডশেডিং হয়ে গেলে বলতেন, “আলোটা বাথরুমে গেছে”! আর-এক দার্শনিক অগ্রজ ছিলেন আমার রামুদা- রামচন্দ্র গাঁধী, গাঁধীজির নাতি। যারা নির্বাচনে ভোট গণনা করার সময় ‘রিগিং’ করে, তাদের নাকি পবিত্র গ্রন্থ হল ‘রিগ্বেদ’ (ঋগ্বেদ)! এসব স্বর্গত রামুদার পান। স্থিতিস্থাপকতা বলতে ঠিক কি বোঝাচ্ছ, জানি না। তবে বেশি শব্দখেলা হয়ে গেলে প্রায়ই বকুনি খেতে হয় আমার কঠোরতম সমালোচিকা বৃন্দার কাছ থেকে। তখন আবার ছেড়ে দেওয়া ইলাস্টিকের মতো স্বল্পায়তন হয়ে শব্দ ছেড়ে অর্থের দিকে নজর দিই। তবে কিনা সেই ‘অর্থ’ মানে টাকা কি না, এই শ্লেষপ্রিয় কৌতূহল থেকেই যায়!
প্র: আপনাকে এই জানা- কতটুকু জানা যায়? নাকি আপনাকে এই জানা কখনও ফুরোয় না?
উ: মনে হয়, আত্মপ্রবঞ্চনার এবং ভাবের ঘরে চুরির স্তরের পর স্তর বিছানো রয়েছে। আসল আমি খোঁজার কাজ তো এ যাত্রায় শেষ হবে বলে মনে হয় না। মদ্যপায়ী যদি হতাম ঋত্বিক ঘটকের মতো, তাহলে হয়তো বলতাম, ‘আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়’।
কিন্তু নানাদিক থেকে মারধর খেয়ে- ঠাকুরের ভাষায় ‘কখনো বারোতলা কখনো গাছতলা’র শিক্ষালাভ করে- ওই সব জুড়ে থাকা অহম্টিকে জানার কাজটা- বলতে নেই অন্তত শুরু করা গেছে বলে মনে হয়। মরলে পর একটা ব্রেক হবে। সেই সময়ে তোমরা একটু বিজ্ঞাপন-টিজ্ঞাপন দিয়ো। তারপর- এক ব্রেক কে বাদ- এই আত্মসন্ধানী সিরিয়াল আবার চলবে। আশা করছি। প্রথম ক্রিটিক-এর শেষে মহামতি কান্ট তাই সব থেকে জব্বর প্রশ্নটা তুলেছেন- ‘আমরা কী আশা করতে পারি?’