সাক্ষাত্কার বাণী বসু

| |

আমি কম লিখি। পেশাদার নই। ভাষা নিয়ে, বিষয় নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে ইচ্ছে করে।
ধরা পড়ল তাঁর লেখকজীবনের নানা অজানা কথা, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর ভাবনা-চিন্তাও। ‘মৈত্রেয় জাতক’, ‘অষ্টম গর্ভ’-র স্রষ্টা বাণী বসুর সাক্ষাত্‌কার নিলেন তিলোত্তমা মজুমদার।
জুনের অন্তভাগের সন্ধ্যা। সাড়ে ছ’টায় সময় দিয়েছিলেন সাহিত্যিক বাণী বসু। বর্ষায় কলকাতার অবশ্যম্ভাবী যানজটে আধ ঘণ্টা দেরি হল পৌঁছতে। দূরভাষে সাক্ষাত্‌ প্রার্থনা করেছিলাম যখন, জানতে চেয়েছিলেন, ‘কতক্ষণ সময় নেবে বলো তো?’
তাঁর কণ্ঠস্বরের গাম্ভীর্যে দীর্ঘ সময় বাক্যালাপের অনুরোধ জানাতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। ফলত, ঘণ্টাখানেক সময় আদায় হল। তার ওপর আমার বিলম্বিত আগমন। সঙ্কুচিত চিত্তেই বাজালাম দরজাঘণ্টি। খুলল দরজা। বাণীদি। স্মিত, প্রসন্ন। সাদা আর খয়ের রঙা তাঁতের শাড়ি পরিপাটি তাঁকে ঘিরে আছে। সুবিন্যস্ত সুসজ্জিত তাঁর বৈঠকখানা। স্নিগ্ধ আলো। সে-ঘর থেকে চোখে পড়ল তাঁর কাজের ঘরখানি। দেওয়াল জোড়া বই। এমনই প্রত্যাশা ছিল।
আমার চা-জলখাবারের জন্য ভারী আন্তরিকভাবে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন বাণীদি। ধীরে ধীরে আমার সঙ্কোচ কেটে যাচ্ছিল। আমরা আলাপ শুরু করলাম
তিলোত্তমা: আপনার অধ্যাপনা-জীবন সম্পর্কে কিছু বলুন। আপনার লেখক সত্তার প্রেরণা হিসেবে এই অধ্যাপনা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ?
বাণী: অধ্যাপনা নিজেরও একরকম গড়ে ওঠার সময়, জান তো? আমরা তো আসলে ফাঁকিবাজ। নিজের পছন্দ এবং প্রয়োজনের বাইরে পড়াশোনা করতে চাই না। জীবিকা হিসেবেই আমার পড়ানো। কিন্তু পড়াতে গিয়ে নিজেও অনেক পড়লাম, অনেক জানলাম। তবে আমি ছোট থেকেই লেখক হতে চেয়েছিলাম। কলেজ পাশ করে একদিন সরাসরি আনন্দবাজারে অশোককুমার সরকারের সঙ্গে দেখা করতে চলে গেলাম। ভাবলাম ‘দেশ’-এ একটা ডেস্ক জব পাব। জীবিকাও হবে, লিখতেও পারব। কিন্তু উনি বললেন, পত্রিকার কাজে মেয়েদের নেওয়া হয় না। যদি লিখতে পারো তো লেখো। তখন অন্য কাজের কথা ভাবতে হল। পড়ানোর কাজটা পেয়ে গেলাম।
প্র: অল্পবয়সি ছেলেমেয়ের সঙ্গে মেশার সুযোগ বাড়ল। না, আপনার তো বোধহয় গার্লস কলেজ...
উ: হ্যাঁ। শুধু মেয়েরা। প্রথমদিকে ছাত্রীদের সঙ্গে আমার বয়সের তফাত কম ছিল। তখন একরকম। পরে তফাত বাড়ল। নতুন কালের ছাত্রীদের জীবন বুঝতে শুরু করলাম। উপর থেকে যেমন, ভিতর থেকেও। অনেকে নানা সমস্যায় উপদেশ-নির্দেশ চেয়েছে। আমি আমার মতো করে তা দিয়েছি। তারা শোনে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সবসময় তারা তা মান্য করবে।
প্র: ছাত্রীরা কি আপনার বন্ধুর মতো?
উ: ভাব হলে খুব ভাব। আড্ডা দেবার সময় তো নেই। তবু তারই মধ্যে কারও কারও সঙ্গে খুব সুন্দর সম্পর্ক। কেউ কেউ আজও নিয়মিত ফোন করে। যোগাযোগ রাখে। আসলে আমাকে তো আপাতভাবে একটু গম্ভীর মনে হয়। ফোনালাপ শুনলেও কেউ কেউ তা মনে করে।
প্র: বাণিজ্যিক পত্রপত্রিকায় আপনার লেখা প্রকাশিত হয়। আপনি কি নিজেকে পেশাদার সাহিত্যিক বলবেন?
উ: না। আমি কম লিখি। পেশাদার নই। কথাটা বাণিজ্যিক বা অবাণিজ্যিক পত্রিকার নয়। গুণমান। বাণিজ্যিক কাগজ হলেও তার উত্‌কর্ষ থাকলে কেন লিখব না? আমি প্রথম থেকে চেয়েছি লেখা ছাপালে তা ‘দেশ’ পত্রিকায়। বা তার মতো রুচিশীল বৈদগ্ধ্যপূর্ণ কোনও পত্রিকায়। সচেতনভাবে চেয়েছি। আই ওয়ান্টেড টু বি ইন গুড কম্প্যানি। তা ছাড়া, একটা লেখা তৈরি করতে কত সময় লাগে, কত পরিশ্রম হয়! তার জন্য দক্ষিণা না থাকলে খুব অন্যায্য ব্যাপার। সংসারে আমি ফাঁকি দিইনি। সব কাজের মধ্যে থেকে লেখার জন্য সময় দিয়েছি, খেটেছি। সৃষ্টির একটা অর্থমূল্য থাকা দরকার।
প্র: কেউ চাইলে...
উ: বড় লেখা সাধারণত দিই না।
প্র: লিট্ল ম্যাগাজ়িনে লেখেন না?
উ: না। তার দু’টি কারণ আছে। প্রথমত, আমি মনে করি, এগুলি আঞ্চলিক প্রতিভার সহায়ক। মন্দ-ভাল দু’রকম লেখাই এতে থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে খুব ভাল লেখাও থাকে। কথা কী জান, লিট্ল ম্যাগাজ়িন যাঁরা করেন, তাঁরা বাণিজ্যিক কাগজের লেখকদের খুব নিন্দা করেন। অথচ তাঁদের কাছেই লেখা চান। বড় লেখকরা
যদিও-বা তাঁদের লেখা দেন, সেসব বাঁ হাতের লেখা। কী হয় তেমন লেখা নিয়ে? আর দ্বিতীয় কারণ কী জান? জীবনের প্রথম দিকে একটি লিট্ল ম্যাগাজ়িনে লেখা পাঠিয়েছিলাম। তাঁরা ছাপেননি। সেই পত্রিকা চালাতেন আমাদের খুব পরিচিত একজন। তিনি লেখাটা হাতে নিয়ে দেখলেন, মন্তব্য করলেন প্রতিভা বসু!
প্র: ব্যঙ্গ করে?
উ: হয়তো ব্যঙ্গ! কী বলতে চেয়েছিলেন তিনি, আমি জানি না। কিন্তু ছাপলেন না। এমনকী, ছাপবেন না যে, তা জানালেন না পর্যন্ত। আমি লাজুক। তাই আমাকে ভাবতে হল, আমাকে চেষ্টা করতে হবে। কারও প্রত্যাখ্যান মানতে পারব না। আমি ‘আনন্দমেলা’য় লেখা পাঠাতে লাগলাম। ছাপা হল।
প্র: লেখক হওয়া আপনার ক্ষেত্রে জীবনের ঘটনাচক্র নয়। স্বেচ্ছানির্বাচন। কোনও আদর্শ ছিল কি এই নির্বাচনের পেছনে?
উ: দিদি গৌরী ধর্মপাল। দিদি পড়াতেন। আমাদের সব ছোট ভাইবোনদের নিয়ে দেশ-বিদেশের গল্প শোনাতেন। গল্প মানে শুধু কাহিনি নয় কিন্তু, সাহিত্য, কবিতা, এমনকী প্রবন্ধও তিনি পড়ে শোনাতেন। দিদির কাছ থেকে আমরা ছোটবেলাতেই পৃথিবীর সাহিত্যের স্বাদ পেয়েছিলাম। বাড়িতে প্রচুর বই ছিল। খুব পড়তাম। ছোটরা মিলে পত্রিকা করতাম। তাতে লিখতাম।
প্র: কোথায় কেটেছে আপনার ছোটবেলা?
উ: উত্তর কলকাতায়। শ্যামপুকুরে।
প্র: ‘আনন্দমেলা’য় লিখতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু পরে তো ছোটদের জন্য সেভাবে লেখেননি।
উ: ছোটদের জন্য লেখা, সেভাবে ভাবিনি, হয়ে গেল। তখন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ‘আনন্দমেলা’-র সম্পাদক। প্রথমে কবিতা নিয়ে গেলাম তাঁর কাছে। বললেন, কবিতা অনেক পাই। গল্প লেখো। বাড়িতে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আছে? ...আমার জায়েদের বাচ্চারা ছিল। আমার ছেলেমেয়ে তারাও তখন ছোট। তাদের মনগড়া গল্প অনেক শুনিয়েছি। বললাম সেকথা। উনি বললেন, তবে তুমি পারবে। যতদিন নীরেনদা ছিলেন, লিখেছি। তারপর ...জোর করে নিজের জায়গা করা, এলবোয়িং মাই ওয়ে, আমি পারি না। চলে আসি। চাওয়া হলে লিখি। ছোটদের জন্য লেখার যে-আবেগ ছিল, লেখা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা আঘাত পেল। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। মেজাজ খুব গুরুত্বপূর্ণ জান তো। শিল্পী বলো, কবি বা সাহিত্যিক বলো, মেজাজ না থাকলে কিছুই ঠিকমতো হয় না। ছোটদের জন্য লেখা কমে এল। ‘দেশ’ পত্রিকাতেও তো লিখতাম তখন। স্থির করলাম, বড়দের জন্যই লিখি তবে।
প্র: ছোটদের লেখক আর বড়দের লেখক এঁদের ভাবনার জগত্‌ পৃথক হওয়া কি জরুরি?
উ: পুরোপুরি। দু’টি মনোজগত্‌ একেবারে আলাদা। একই লোক দুই-ই লিখতে পারেন, তবে তাঁকে এক জগত্‌ থেকে বেরিয়ে অন্য জগতে প্রবেশ করতে হবে। আমি ছোটদের জন্য লিখেছি। কিন্তু শিশুদের জন্য তেমন কিছু লিখিনি। সেই জগত্‌ আরও অন্যরকম। বরং দিদি গৌরী ধর্মপাল লিখতেন শিশুদের জন্য। সেগুলো সবাই ভালবাসত।
প্র: হ্যাঁ। খুবই ভাল। বড়রাও সেগুলো পড়েন।
উ: ছোটদের লেখা বড়রা বেশি করে পড়েন। অনেক সময় বড়দের চোখে তার নতুন অর্থ তৈরি হয়।
প্র: একেবারেই ঠিক। আচ্ছা, সত্যজিত্‌ রায়কে আপনি সাহিত্যিক হিসেবে কী মূল্য দেবেন? আমি ফেলুদা বা শঙ্কুর কথা বলছি না। তা বাদে ওঁর যে শতাধিক ছোটগল্প আছে, সেইসব?
উ: খুব ভাল। টানটান ভাষা। তার জন্য সাহিত্যমূল্য কমে না। ফেলুদার চেয়ে ওই গল্পগুলোরই আমি বেশি ভক্ত। সত্যি বলতে কী, একটা বয়সের পর তো ফেলুদা পড়ার মজাটাই শুধু থাকে। তখন ছেলেমানুষীটুকু বাদ দিয়ে পড়ার আনন্দ নিতে হয়। ওই তথ্যগুলো ...এখানে এটা হয়, সেখানে সেটা হয়, সে আর দরকার হয় না। কিন্তু অবশিষ্ট গল্পগুলো, তুমি যে শতাধিক গল্পের কথা বলছ, সেগুলো মনে রাখার মতো। কোনও আরোপিত জটিলতা নেই। আর কী এমপ্যাথি! অসম্ভব এমপ্যাথি! আর সম্পূর্ণ প্রেমবিবর্জিত।
প্র: হ্যাঁ। ওঁর গল্প থেকে প্রেম একেবারে বাদ পড়েছে।
উ: এটা বিরাট ব্যাপার। লেখার মধ্যে প্রেম বা সেক্স অপরিহার্য, আমি তা মনে করি না। সত্যজিত্‌ রায় তা দেখিয়ে দিয়েছেন। অত সহজভাবে পটলবাবুর মতো চরিত্র তুলে আনা...
প্র: কয়েকটি চরিত্রের মধ্য দিয়েই সামাজিক অবস্থান বুঝিয়ে দেওয়া...
উ: এবং তার জন্য প্রেম, সেক্স, সামাজিক তত্ত্ব কিছুই লাগে না। আমি এটা পিয়োরিটি বলব। বাংলা সাহিত্যে এমন আর-একজনের নাম করো। পারবে? শুধু বাংলায় কেন? বিশ্বসাহিত্যে?
প্র: চেকভের বেশ কিছু গল্প, বা ধরুন, ডিকেন্স?
উ: আমি কিন্তু বাংলাতেই একজনের নাম বলব। বুদ্ধদেব বসু।
প্র: বুদ্ধদেব বসু?
উ: হ্যাঁ। তাঁর ছোটদের জন্য লেখাগুলো পড়েছ? হারান জ্যাঠার মতো চরিত্র, ভাবা যায় না! সত্যজিত্‌ রায় এবং বুদ্ধদেব বসু দু’জনেই সেদিক থেকে অসামান্য।
প্র: আপনি ‘পিয়োরিটি’ শব্দটা বলছেন ...আমি কি তাহলে আপনাকে খানিকটা রক্ষণশীল বলব?
উ: বলতে পারো। লেখায় যথেচ্ছ সেক্স ব্যবহার আমি মানতে পারি না।
প্র: কিন্তু সেক্স বাদ দিয়ে ভাবতেও তো পারি না?
উ: সেক্স, সে তুমি যাই বলো, এ তো একটা জৈব তাগিদ। আমাদের তো আরও আরও নিত্য কত জৈব কর্ম থাকে। সব কি আমরা কাহিনিতে চরিত্রদের মধ্যে আনি? অভ্যাস ও প্রবৃত্তি আনার প্রয়োজন হয় না। সেক্সও প্রয়োজন নেই সব জায়গায়। যেমন দেবেশ রায়ের ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’। সেই নারী চরিত্রটি ...প্রায় নামহীন ...শি ইজ় ইনটু দ্যাট কাইন্ড অফ লাইফ। সে অনেক জন্ম দিচ্ছে, ছেলেমেয়েরা তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
প্র: ধরিত্রীর মতো...
উ: বা ভারতবর্ষের প্রতীক। সেখানে জন্মের যান্ত্রিকতা, ছেড়ে যাওয়ার ঔদাসীন্য কিংবা যন্ত্রণা প্রধান। সেক্স নয় কিন্তু। তোমার লেখার উদাহরণও দিই। তোমার ‘জোনাকিরা’ উপন্যাস দেখো। ওইরকম একটা মিশ্রিত সংস্কৃতি ও ভাষাভাষী অঞ্চল, নিম্নবিত্ত মানুষের বসতি, সেখানে প্রসঙ্গত সেক্স আছে কিন্তু মূল ফোকাস সেটা নয়। দেখো, যৌনতা ছাড়াও মানুষের মনোজগতে বিশাল এলাকা রয়েছে। খুবই বিচিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ সেইসব। জীবনের কোনও কোনও পর্বে যৌনতা একটা অভ্যাস মাত্র। একটা যান্ত্রিক ব্যাপার। কিংবা সেটুকুও নয়। একেবারে মূল্যহীন। মনের অন্য সব দিক তাকে ছাপিয়ে যায়। আর যৌনতা যদি প্রয়োজন হয়ই, সাহিত্যে তার ভাষা আলাদা।
প্র: ছোটগল্পের সিদ্ধি আর উপন্যাসের সার্থকতা কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? আপনি তো দুই-ই লেখেন। তা ছাড়াও এই দুইয়ের মাঝে খুব বড় নয়, খুব ছোট নয়, এমন লেখাও আপনার বেশ কিছু আছে, যেগুলোর মধ্যে দারুণ সব মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পাই।
উ: দেখো, এগুলো এককথায় বোঝানো খুব শক্ত। সংজ্ঞায় ফেলে বিচার করা যায় না। উপন্যাসের সংজ্ঞা কী? যদি সংজ্ঞা করা যায়, তার মধ্যে উপন্যাস আবদ্ধ থাকে না। ইট ইজ় অ্যাবসোলিউটলি ফ্রি টু অ্যাক্ট অ্যাজ় ইট প্লিজ়েজ়। একটা লেখা, তার ফর্ম যাই হোক না কেন, যদি থাকার হয়, থাকবে। আর ছোটগল্প তো বলাই হয়, শেষ হয়ে হইল না শেষ। এর বিভিন্ন রকম আছে। খুব ধার নিয়ে চলছে, একটা আশ্চর্য আকস্মিকতায় তা শেষ করা যায়। আবার ভেবেচিন্তে প্ল্যান কষে শেষ করা যায়। নিয়ম নেই কিছু। তবে সাহিত্যে আয়তন এবং কনডেনসেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ। তুমি বড়গল্পের কথা তুললে বলে ভাল লাগল। এটা আমার খুব প্রিয় ফর্ম। এ যেন খানিক গল্প, খানিক উপন্যাস। আসলে, টপিক ডিম্যান্ডস ইট। অনেক ইনটেন্স। একটা ঘোর তৈরি হয়। সেই ঘোরের মধ্যে লেখাটা গড়ে ওঠে।
প্র: আপনি আবিষ্ট হতে পারছেন। আপনি ওতে স্বচ্ছন্দ।
উ: কনডেনসেশনের এমন আবেশ আমি আর কিছুতে পাই না। আমার খুব প্রিয়। প্রকাশকরাও আমার কাছে এটা চান। বড়গল্প লিখে দিন। তাতে সমস্যাও হয়। ধরো, যে-থিম এল সেটাতে বড়গল্প হবে না। তখন মুশকিল।
প্র: তবু, প্রকাশক চাইলে তো ভালও লাগে। তার মানে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা আছে।
উ: সেটা ঠিক। লেখক হিসেবে আমার ভাল লাগে। উপন্যাসে অনেক লিখতে হয়। সবসময় সেটা ভাল লাগে না। আবেশটাও তো থাকে না একটানা। আয়তনের কথা মাথায় রাখতে হয়। আবার পাঠকও বিচিত্র। কেউ কেউ ছোটগল্পে পরে কী হবে ভাবেন। যেখানে শেষ হল, তার পরের নানান সম্ভাবনার সূত্র তাঁদের মনে আসতে থাকে। যাঁরা খুব অধৈর্য তাঁরা ভাবেন, যাঃ, কিছুই তো বোঝা গেল না। আবার উপন্যাস পড়াও ধৈর্যসাপেক্ষ। বড়গল্প এই দুইয়ের মধ্যে একটা সামঞ্জস্য আনে।
প্র: আপনার লেখাকে কেউ মেয়েলি বলেছে?
উ: বলেনি। (হেসে) আমার সঙ্কল্প ছিল, এমন ভাষা আয়ত্ত করব যাতে কেউ এমন বলতে না পারে।
প্র: আপনি সফল। কিন্তু ধরুন সুচিত্রাদির ক্ষেত্রে, মানে সুচিত্রা ভট্টাচার্যর বেলায় লোকে নারী-সাহিত্যিকের সঙ্গেই তাঁকে তুলনা করত...
উ: আমাকেও তাই। পুরুষমানুষের সঙ্গে তুলনা করে না। আমি কিন্তু করেছি। আশাপূর্ণা দেবীকে শরত্‌চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তুলনা করেছি। প্রথমদিকে আশাপূর্ণা শরত্‌চন্দ্র দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। পরে সম্পূর্ণ স্বাতন্ত্র্যে সাহিত্যরচনা করলেন! নারী সাহিত্যিক কাকে বলে বলো তো? শরত্‌চন্দ্রের চেয়ে বড় নারী সাহিত্যিক আর কে?
প্র: হ্যাঁ। ওরকম নারী মন বোঝানো! নারীর স্নেহ, প্রেম, বিপন্নতা...
উ: তা হলে? তাঁর ধারাটাই সাহিত্যের ধারা হিসেবে রয়ে গেল। মানিক এবং আশাপূর্ণা দু’জনেই শরত্‌চন্দ্রের ধারা দিয়ে শুরু করলেও পরে সেসব পালটে যায়। নিজস্ব শৈলী এবং বিষয় নির্বাচন করে বিরাট হয়ে উঠলেন আশাপূর্ণা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরও একটা ঘরানা আছে। তা আরও ব্যাপ্ত হতে পারত। গোড়ার দিকের মানিক নিজেকে বদলে ক্রমশ অন্ত্যজ জীবনের প্রতি আগ্রহী হলেন। এটা তাঁকে আলাদা করে দিল।
প্র: আপনার ‘মেয়েলি আড্ডার হালচাল’ লেখার পেছনে সত্যিকারের কোনও আড্ডা আছে কি?
উ: উপন্যাসে যেমন, ঠিক সেরকম নয়। আমার সহকর্মীরা, ধরো বয়সে ছোটও তারা, দে ইউজ়ড টু বি ভেরি ফ্রেন্ডলি টু মি। আমরা একটা ইনটেলেকচুয়াল আড্ডা দিতাম কলেজে। নানা বিষয়ে কথা, তর্ক। সাহিত্য, সিনেমা, নাটক, ছবি। তার প্রভাব আছে হয়তো। বাস্তব চরিত্রের প্রভাব এবং আদল আমার অনেক উপন্যাসেই আছে। (হেসে) পরে এ নিয়ে খুব হাসাহাসি হত। আমি যে ইচ্ছে করে করেছি, তা নয়। ভেবে তো এসব হয় না। লিখতে বসে হয়ে গেছে। অনেকে আবার অভিযোগ করে বলেন আমার কথা কেন লেখো না?
প্র: কেউ রাগ করেছে? ধরুন, নিজের সঙ্গে মিল পেল বা চেনা কারও সঙ্গে, তাতে ক্ষুব্ধ হল...
উ: হ্যাঁ। (হেসে) তবে সামলানো গেছে। সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর্যায়ে যায়নি। আসলে যা দেখি হুবহু তাই তো সাহিত্যে আসে না। কল্পনার সঙ্গে মিশে যে নির্মাণ, লোকে তা বোঝে না। মিল-অমিল দুইয়েতেই ভুল বোঝে।
প্র: গল্প-উপন্যাসের সূত্র কীভাবে আসে আপনার কাছে? যাকে সাদা কথায় প্লট বলে?
উ: নানাভাবে আসে। কিছু দেখলাম, শুনলাম। বা স্রেফ এসে গেল। হঠাত্‌। আসে, এসে চলে যায়। কখনও যে-ভাব নিয়ে লেখা শুরু করি, সেই ভাব থাকে না। হারিয়ে যায়।
প্র: কী করেন তখন?
উ: কী করব? লেখা ফেলে রাখি। হয়তো সে লেখা আর হলই না। কখনও প্লট হিসেবে লিখে রাখি। তা-ও হারিয়ে ফেলি। আমি খুব এলোমেলো স্বভাবের। হয়তো কোনও ভাবনা এল, চুম্বক লিখে রাখলাম, তবু ভুলে গেলাম। এ প্রসঙ্গে শরত্‌চন্দ্র আর রবীন্দ্রনাথের ভাষ্য জান তো? শরত্‌চন্দ্র আগাগোড়া ভেবে বেঁধে লিখতেন। রবীন্দ্রনাথ লেখা শুরু করতেন, তারপর যেমন যেমন আসে। আমার রবীন্দ্রনাথের মেথড। ছক বাঁধলেও কেটে বেরিয়ে যায়। প্ল্যান কাজে লাগে না। চরিত্র তার নিজের মতো বেড়ে ওঠে। যখন লেখা হতে থাকে, চরিত্র নিজে তাতে নতুন মাত্রা যোগ করে। এটা একটা মিস্ট্রি। কমপ্লিটলি ইনএক্সপ্লিকেবল এলিমেন্ট। ‘গান্ধর্বী’-তে অপালাকে দিয়ে ছবি আঁকাব ভাবিনি। হয়ে গেল। দ্যাট ইজ় দ্য ওয়ে অফ মেনি মেনি রাইটার্স। রবীন্দ্রনাথ যে অত বেশি বয়সে ছবি আঁকতে শুরু করলেন, সেই ছবি আঁকা ফ্যান্সি নয়, এটা মুক্তি। বনফুল, তারাশঙ্কর ছবি আঁকতেন। তার জন্য তারাশঙ্করের অনেক সমালোচনা হয়েছিল। আসলে তাঁদের কিছু করার ছিল না। কিছু হচ্ছে কি হচ্ছে না, সেটা কথা নয়। একটা আর্ট ফর্ম একজ়স্ট করে গেলে ক্রিয়েটিভিটি অন্যদিকে ঠেলে দেয়।
প্র: আপনার ‘গান্ধর্বী’ একটি চমত্‌কার লেখা। এর অপালা প্রতিভাময়ী, কিন্তু রক্ষণশীলতার বেষ্টনীতে বিপর্যস্ত। আপনি লিখেছিলেন নব্বইয়ের দশকে। এটা ২০১৫। এই চিত্র কতটুকু পাল্টেছে?
উ: এখনও একই আছে। কতজন ফোন করে বলে, আপনি কী করে আমারই কথা লিখলেন গান্ধর্বী-তে! কেউ তার মায়ের কথা বলে। তাঁরও এমনটাই ঘটেছিল। ট্যালেন্টেড লোক মাত্রই মিসআন্ডারস্টুড। যে-কোনও প্রতিভা। যদি মেয়ে হয় তো আরও বেশি। পুরুষদের ক্ষেত্রে একরকম। প্রতিষ্ঠার চাপ। রোজগার। কেউ হয়তো ছবি আঁকে, আঁকতে দেবে না। সে যে সফল হবেই, তা তো নয়। কিন্তু একজনকে তার প্রতিভা নিয়ে গ্রো করার জায়গা দিতে হবে তো। সকলেই গণেশ পাইন হয় না। ধরো, প্রতি বছর আর্ট কলেজে কত ছেলে পড়তে আসছে, পরে ক’জন নাম করছে? তাদেরও নানা ধাক্কা সহ্য করতে হয়। কেউ মিডিয়োক্রিটিতে আটকে যায়, কেউ হারিয়ে যায়। আর মেয়েদের তো কিছু করতেই দেবে না। বেসিক্যালি কিছু পাল্টায়নি, একটা আভিজাত্যের মোড়ক পড়েছে। মেয়েকে শ্যামাসংগীত শোনাতে হবে, তা-ও হারমোনিয়াম বাজিয়ে, কিন্তু রেওয়াজ করতে দেবে না।
প্র: আপনার লেখার মুহূর্তগুলোর কথা আরও কিছু বলুন।
উ: কী বলব? ওই যে বলছিলাম একটা ঘোর তৈরি হয়। ছোটগল্প মনে আসার সঙ্গে সঙ্গে লিখে ফেলা দরকার। ঘোরটা থাকতে থাকতে। উপন্যাসে যতক্ষণ সেই ভাবটা না আসে, কিছুতেই কিছু হয় না। ঘোর এল। লিখলাম। কিন্তু থামতে তো হয়। উপন্যাস একটানা তো লেখা যাবে না। আবার ঘোর এল, এমনি করে ইউ আর কমপ্লিটলি ইনভলভড ইন ওয়ার্ক তখন জিনিসটা দাঁড়ায়।
প্র: সেই ঘোরের সময় কেউ ইনটারাপ্ট করলে রাগ হয়?
উ: আমার সবসময়ই তাই। ফোন আসে। কথা বলি।
প্র: লেখার সময়ও ফোন ধরেন?
উ: হ্যাঁ, ধরি। তা ছাড়া বাড়ির কাজ। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করল, কেউ এল। আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। আমি হয়তো লেখা ছেড়ে উঠলাম, কথা বললাম, ঘোরটা কিন্তু থাকে। আমি তাতে ফিরতে পারি। অত কনসেনট্রেশন, যা ভেঙে গেলে রাগ হয়, সেটা ছাড়াই আমি লিখতে পারি। হয়তো এটা একটা ব্লেসিং। নাহলে আমি কী করতাম? বিদেশে লেখকরা সব ঘর বন্ধ করে লেখেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অতক্ষণ ওভাবে আমি লিখতেই পারব না। আমি একটু মেলামেশা করব। আড্ডা দেব। লেখাটা মাথায় থাকবে। কিন্তু মাঝে মাঝে ব্রেক, কথা বলা, আমার কাজে দেয়। এখানে পুরুষ লেখকরা কিন্তু ওই করে। দরজা বন্ধ করে লেখে। আমাদের মধ্যে সুচিত্রা করত। ও পরিবারের সাহায্য খুব পেত।
প্র: ঘষে-মেজে লেখক হওয়া কি সম্ভব? না এই গুণ নিয়েই মানুষ জন্মায়?
উ: লেখক লেখক হয়েই জন্মায়। পরে ঘষা-মাজা।
প্র: ছোটবেলার পড়া কি লেখক হওয়ার পক্ষে সহায়ক?
উ: শুধু লেখক হওয়ার পক্ষে নয়, মানুষ হওয়ার পক্ষেও। আজকাল যে ছেলেমেয়েরা তেমন পড়ছে না, তাতে খুব দুঃখ পাই। সব্বাই যদি খানিক পড়ত, অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। পড়ার মধ্যে দিয়ে মনটা মুক্তি পায় তো। আমার মনে আছে, টেস্ট পরীক্ষার সময় সারা রাত জেগে গজেন্দ্রকুমার মিত্রর ‘রাত্রির তপস্যা’ পড়েছি। মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে প্রেম। কী চমত্‌কার লেখা। পড়তে পড়তে ভোর হল। কে যেন বলল, তোর আজ পরীক্ষা না? যাবি না? তখন মনে পড়ল। কত টেনশন চলে গেল বই পড়ার মধ্যে দিয়ে (হাসি)।
প্র: একজন সাহিত্যিকের জীবন কি ঘটনাবহুল হতেই হয়? নাকি তাঁর শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাই যথেষ্ট?
উ: জীবন ঘটনাবহুল হলে ভাল। কিন্তু তা সবসময় হয় না। ব্যাপারটার মধ্যে সরল সমীকরণ নেই কিন্তু। ধরো, এমন অনেক লেখক, তাঁরা হয়তো সরকারি চাকরি করেন এবং সেই সুবাদে গ্রামাঞ্চলে বা অন্যান্য জায়গায় মেলামেশার সুযোগ পান। প্রচুর অভিজ্ঞতাও তাঁরা অর্জন করেন। তাঁরা সকলেই কি বড় লেখক হয়ে উঠতে পারেন? লেখকের ক্ষেত্রে ইনডাইরেক্ট এক্সপিরিয়েন্সও খুব কার্যকরী। আমি জীবনে এক্সট্রাম্যারিটাল করিনি, তো আমি তা নিয়ে লিখব না? কল্পনা ও বাস্তব মিশিয়ে লিখতে হয়। যেখানে ঘটনা নেই, লেখক সেখান থেকে ঘটনা খুঁজে নেবে।
প্র: ‘মৈত্রেয় জাতক’ একটি গবেষণাধর্মী উপন্যাস। এই রচনার পশ্চাত্‌পট একটু বলুন।
উ: বলতে পার মহাপুরুষদের প্রতি কৌতূহল থেকে এর জন্ম। তাঁদের অ্যাক্জ়িওমেটিক্যালি বিচার করা হয়। গৌতম বুদ্ধকেও তাই করা হয়েছে। আমি তাঁকে জানতে চেয়েছিলাম। তাই পড়াশোনা শুরু করলাম। রবিঠাকুর তাঁকে বলেছেন পরম কারুণিক। আমার রাগ হয়। কেন এমন একপেশেভাবে দেখানো হবে? গৌতম বুদ্ধ তো একজন বাস্তব ব্যক্তি। জাতকের কাহিনিতে কিন্তু শুধু করুণা নেই, আরও অনেক কিছু আছে। মৃতবত্‌সা জননীকে পাঠালেন, ঘরে ঘরে ঘুরে সেই গৃহ থেকে এক পাত্র সরষে নিয়ে এসো যেখানে মৃত্যু নেই। রুথলেস র্যাশনালিটি। শ্যামার আসল গল্পে শ্যামাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল বুদ্ধের এক জাতক বজ্রসেন। রবীন্দ্রনাথ চিত্রিত বজ্রসেনে যেটুকু দয়া-করুণা ছিল, মূল গল্পে তা ছিল না। প্রচণ্ড র্যাশনাল কিন্তু ফিক্সড আইডিয়া প্রপাগান্ডা করতেন বুদ্ধদেব। সেই আইডিয়াগুলি আবার পরস্পরবিরোধী। সংসার ত্যাগ করো অথচ সংলগ্ন থাকো। তিনি সংসার ত্যাগ করলেন কিন্তু রাজা ও বণিকদের সঙ্গ করতে লাগলেন। হিংসা বন্ধ করতে চাইলেন, সাধারণ মানুষকে বোঝালেন মেটেরিয়ালিস্টিক না হতে, বণিকদের বললেন, উপার্জিত ধন একলা ভোগ কোরো না। দান করো। অনাবশ্যক বিলাসিতা কোরো না। বুদ্ধ যদি রাজা হয়ে এই প্রয়াস নিতেন, অনেক বেশি সফল হতেন। ওঁর নীতিগুলির মধ্যে যেগুলি ভুল মনে হয়েছিল, সেসব প্রতিপাদ্য করার জেদ চেপে গেল আমার। উপন্যাসে এমন একটা চরিত্র দাঁড় করালাম, যে এই নীতিগুলি নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। তারপর ধরো, মেয়েদের প্রতি ওঁর ব্যবহার? আমি চৈতন্যকে তবু খানিকটা বুঝি, তিনিও বিষ্ণুপ্রিয়াকে ছেড়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু বুদ্ধকে এখানটায় আমি বুঝি না। বুদ্ধ যে রোগ-জরা দেখলেন, মৃত্যু দেখলেন, তারপর গৃহত্যাগ করলেন, যেমন আমরা গল্পে পাই, এমনটাই তো ঘটেনি। এসব অশ্বঘোষের ‘বুদ্ধচরিত’ থেকে নেওয়া। এই রোগ-জরা-মৃত্যু এগুলো বুদ্ধদেবকে ভাবাত। এসব নিয়ে তিনি স্ত্রী যশোধরা এবং পিতা শুদ্ধোদনের সঙ্গে আলোচনা করতেন। যশোধরা সাধারণ রমণী ছিলেন না। যুদ্ধপারদর্শিনী, বিদ্যাবতী। এই স্ত্রীকে সদ্যোজাত সন্তান সমেত ফেলে চলে গেলেন। নারীত্যাগ। সিদ্ধি লাভ করে কপিলায় ফিরে সকলের সঙ্গে একাই দেখা করলেন। কিন্তু এত বছর পর যশোধরার কাছে গেলেন শিষ্য পরিবৃত হয়ে। যেন তাঁর প্রমাণ করার দায় তিনি কত সংযত! যেন তিনি একলা গেলেই শিষ্যরা প্রশ্ন তুলত তাঁর সংযম বিষয়ে। এত ভঙ্গুর বিশ্বাস? তা হলে আর লিডার কিসের? দীর্ঘ পথ হেঁটে গৌতমী ও যশোধরা শিষ্যত্ব নিতে গেলেন। আনন্দ বললেন বলে মঠে তাঁদের জায়গা দেওয়া হল। অথচ তপস্যার পর তাঁকে প্রথম পরমান্ন দিয়েছিল এক নারী সুজাতা। আমার বরং চণককে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়। চণক কিন্তু নারীত্যাগী নন। তিনি বারবণিতা সংসর্গ করেছেন, কিন্তু স্বধর্মে স্থির। অন্যদিকে বুদ্ধর ব্যবহার দেখো। এক বারবণিতা মারা গেলে এক ভিক্ষু তার প্রতি প্রেমে জীবিকাসন্ধান ত্যাগ করল। বুদ্ধদেব মৃতদেহের সত্‌কার বন্ধ করে দিলেন। প্রতিদিন সে দেহ গলিত, বিকৃত হচ্ছে, প্রতিদিন সেই ভিক্ষুকে ডেকে ওই দেহ দেখাচ্ছেন। দেখো, যার জন্য অত শোক তোমার, সে আসলে কী। তখন চণক এসে প্রতিবাদ করলেন। তিনি বললেন, ওই বারবণিতা নিজ পেশায় সত্‌ থেকে মারা গেছে। আপনি তাকে অসম্মান করছেন। ...এই হল আমার মত। আমি বুদ্ধদেবকে শ্রদ্ধাও করি। আবার তাঁর ভুলগুলির জন্য খারাপ লাগে। আমি তাঁকে জানতে চেয়েছিলাম। বুঝতে চেয়েছিলাম, সেই যুগে তিনি কীভাবে গৃহীত হয়েছিলেন। আজও কেউ একটু বিখ্যাত হলে সকলে তাকে টেনে নামাতে চায়। তাঁর সম্পর্কে পড়াশোনা করে, পরে উপন্যাস লিখতে লিখতে মনে হয়েছিল। আমি সত্য দেখতে পাচ্ছি।
প্র: আপনি বলছিলেন চৈতন্যকে বুঝতে পারেন...
উ: হ্যাঁ। খানিকটা পারি। কৈশোর প্রেমের স্ত্রী লক্ষ্মীকে যে হারালেন। উদাসী হয়ে গেলেন। সেই বেদনাই হয়তো তাঁকে ত্যাগের পথে নিয়ে গিয়েছিল। বিষ্ণুপ্রিয়াকে মানতেই পারেননি। রেজ়িস্ট করতেন তাঁকে। বুদ্ধদেব যে সমমনস্ক স্ত্রী পেয়েছিলেন তার মূল্য তিনি বোঝেননি। শ্রীরামকৃষ্ণ স্ত্রীকে গড়ে নিয়েছিলেন। সে নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। কিন্তু গড়েছিলেন। বিষ্ণুপ্রিয়ার সঙ্গে চৈতন্যের যে-ব্যবহার, তাতে নিষ্ঠুরতা আছে, কিন্তু লজিকও আছে। বুদ্ধের লজিক নেই। মানুষ ওঁদের ভগবান বলে। কিন্তু যুক্তি দিয়ে ভাবলে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। মানুষের মানদণ্ড ছাপিয়ে আমি অন্তত ওঁদের বিচার করতে পারব না।
প্র: এর পর আপনার বৃহত্‌ উপন্যাস ‘অষ্টম গর্ভ’। বিষয়, ভাষা, লিখনশৈলী সব দিক দিয়েই এই উপন্যাস ‘মৈত্রেয় জাতক’-এর চেয়ে আলাদা। আপনি খুব সচেতনভাবেই তা করেছেন নিশ্চয়ই?
উ: হ্যাঁ। সচেতনভাবে। ওতে আমার বেড়ে ওঠার সময়টা লিখেছি। সেটা খুব ঘটনাবহুল। ছোট ছিলাম। তবু দেখেছি তো। মন্বন্তর, দাঙ্গা, স্বাধীনতা, তার কিছুকাল পর নকশাল মুভমেন্ট। পুরো সময়টাই ভারতের ইতিহাসে ইমপর্ট্যান্ট এবং ক্রুশিয়াল। শিশুরা, বালক-বালিকা তারা কীভাবে দেখে? তাদের চোখে এই সমস্ত কীভাবে ধরা দেয়? শিশুদের দেখাটা কৈশোরের পর হারিয়ে যায়। সেই দেখাটুকু খুব মূল্যবান। সেটাই আমি অষ্টম গর্ভে দেখিয়েছি। শিশুদের চোখ দিয়েও এক সত্য জগত্‌ প্রকাশিত। ওদের বিচার-বিশ্লেষণের নীতি সম্পূর্ণ আলাদা। একজন কুত্‌সিত ব্যক্তিও শিশুর চোখে সুন্দর হতে পারে। বা উল্টোটা। জীবনকে বোঝার জন্য এই দেখাটা উপলব্ধি করাও জরুরি। অষ্টম গর্ভে আমি তাই চেয়েছি।
প্র: বিদেশি সাহিত্য আপনাকে আকর্ষণ করে এখনও?
উ: করে। ক্লাসিক বা সাম্প্রতিক। তবে সবাই করে না। ডিকেন্স আমি এখনও বারবার পড়ি। কিন্তু ডস্টয়ভস্কি আর পারি না।
প্র: ধরুন, বাংলা ভাষা যদি ইংরেজির মতো অর্ধেক পৃথিবী অধিকার করত, বাংলা সাহিত্য কি ইংরেজির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারত?
উ: আমি মনে করি পারত। বাংলা সাহিত্যের কী বিপুল সম্ভার বলো তো। এবং সময়টা দেখো তুমি। চর্যাপদ থেকে ধরলে তো হবে না। বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর থেকে ধরলে, এ পর্যন্ত, দু’শো বছরের সাহিত্যে এত সংযোজন, এত উন্নতি, ভাষার কত ভাঙাগড়া, সবটাই বিস্ময়কর। তুলনায় শেক্সপিয়রের কত বছর হল ভাবো।
প্র: সাড়ে চারশো।
উ: তবে? বাংলা সাহিত্যের ভাষা অবশ্য তৈরি হয়েছে দু’জনের হাতে। বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ। কী ভাষা বলো তো বঙ্কিমের বন্দী আমার প্রাণেশ্বর। আজও গায়ে কাঁটা দেয়।
প্র: খুব বোল্ড এটা।
উ: অসাধারণ! পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ? ভাবো, আজও কত প্রাসঙ্গিক! বঙ্কিমের ভাষা আমার খুব ভাল লাগে। সেটা যে তত্‌সম শব্দ ব্যবহারের প্রাবল্যের জন্য তা নয়...
প্র: অপূর্ব ধ্বনিসমন্বয়। খুব প্রাণবন্ত।
উ: খুব প্রাণ আছে। বর্ণনার কী জোর! অথচ বঙ্কিমের ঘরানাটা রইল না। রবীন্দ্রনাথের ঘরানা চলে এল। আবার তাঁর জীবদ্দশাতেই আরও পাল্টে গেল বাংলা ভাষা। ইউরোপের সব ভাষার সাহিত্য এসে ইংরেজিতে মিশেছে। আমাদের অন্যান্য ভারতীয় ভাষার সাহিত্য যোগ করলে কী দাঁড়াবে ভাবো তো।
প্র: হ্যাঁ। হিন্দি তো আছেই। উর্দু, মলয়লম, পঞ্জাবি, কী চমত্‌কার সব লেখা!
উ: কন্নড়? কন্নড়ে লেখা ‘পর্ব’ পড়েছ? এস এল ভইরাপ্পার লেখা। মহাভারত নিয়ে। অপূর্ব।
প্র: শিল্পের অন্যান্য দিক চিত্রকলা, সংগীত, নৃত্য, চলচ্চিত্র কীভাবে আপনাকে প্রভাবিত করে?
উ: সবগুলোতেই রস পাই। তবে নিয়মিত দেখা হয় না।
প্র: এমন কি হয়েছে যে, ছবি থেকে বা গান শুনে কোনও লেখার জন্ম হয়েছে?
উ: ‘ঝড়ের খেয়া’। ছবি থেকে এসেছিল উপন্যাসটা। সে সময় অনেক প্রদর্শনীতে যেতাম। ছবি দেখতাম আর আঁকতে ইচ্ছে করত। তখন আমি অক্ষর দিয়ে ছবি আঁকলাম। রাগী লাল বেড়াল। সাদা কাপড় পরা মহিলার গায়ে চাঁদের আলো। চিত্রকরের মানস-জগতে ঢোকার চেষ্টা করেছিলাম।
প্র: সমাজসচেতনতা কি লেখকের পক্ষে অপরিহার্য?
উ: সম্যক ধারণা থাকা দরকার। অন্তত থাকার কথা। কারও রাজনীতি অর্থনীতি বিষয়ে স্পষ্ট মত না-ও থাকতে পারে, তবু জানা থাকলে ভাল। অপরিহার্য নয় হয়তো। কেউ হয়তো সেক্লুডেড, তবু সে-ও লেখক হতে পারে।
প্র: ধরুন, কেউ সেক্লুডেড ওয়েতে বড় হল। লেখক হল। চিরকাল তো তার সেক্লুশন বজায় থাকবে না। সমাজকে সম্যক জানার দায়বদ্ধতা কি তার থাকবে?
উ: শার্লট ব্রন্টি ও এমিলি ব্রন্টি কিন্তু এভাবেই লিখেছেন। লেখকের কোনও দায় নেই। সমাজনীতি, রাজনীতি, মতবাদ এগুলিকে বেশি প্রশ্রয় দিলে প্রোপাগান্ডা লিটারেচার হয়ে যায়। কোনও ফিক্সড আইডিয়া শিল্পের পরিপন্থী।
প্র: অরহান পামুক আর পাওলো কোয়েলো একালের দু’জন জনপ্রিয় সাহিত্যিক এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। ওঁরা যদি এই লেখাগুলোই বাংলায় লিখতেন, কী হত?
উ: পামুক আর কোয়েলো বলে পাত্তা দিচ্ছে। আমরা লিখলে বলত, থান ইট বসিয়ে দিয়েছে। পামুকের মতো দাঁতভাঙা লিখলে ছাপবেই না। আমাদের বলা হয় ঝরঝরে গদ্য লেখো। প্রেমের গল্প লেখো। ভাষা নিয়ে, বিষয় নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে ইচ্ছে করে। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলে সাহিত্যিকের তৃপ্তি হয় না। রবীন্দ্রনাথ কতবার নিজেকে পাল্টেছেন, সেই সুযোগ লেখককে দিতে হয়। আমি অনেককে দেখেছি, কোয়েলো খুব ভাল বলে কিন্তু ‘দেবযান’ পড়ে হাসে। কোয়েলো বোঝে, বিভূতিভূষণ বোঝে না! অথচ ‘দেবযান’ কী অসামান্য একটি উপন্যাস! পরলোক সম্পর্কে কত গভীর অনুসন্ধান! আমার তো কোয়েলোকে চিপ লাগে। ‘অ্যালকেমিস্ট’ ভাল লেগেছিল। ব্যস। তবে পামুক আলাদা। তুমি বলছিলে সার্থক উপন্যাস বিচারের পথ কী। এক্ষেত্রে পামুক খুব বড় উদাহরণ। তিনি উপন্যাসের সংজ্ঞা ছুঁয়ে পথ ভেঙে চলে যাচ্ছেন। নির্দিষ্ট ফর্ম, ভাষা, রীতি, বিধি মানছেন না। তিনি বলছেন না, আমার লেখা পড়তেই হবে। তিনি তাঁর কাজ করে যাচ্ছেন। ক্রমাগত ভাঙছেন। কাফকার থেকে এই ভাঙনের শুরু। পামুককে আমার মনে থাকে তাঁর গল্পের জন্য নয়, তাঁর উপন্যাসে যে চিন্তা আছে, তার জন্য।
প্র: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে ভারত মুক্ত হতে পেরেছে বলে মনে হয়?
উ: না। মুক্ত হইনি। চারপাশ দেখে, আমাদের দৈন্য দেখে দুঃখ হয়। আমরা সহজেই অধীন হয়ে যাই। এখন আমরা কালচারাল কলোনিয়ালিজ়মের অধীন। খুবই সাসেপটিবল আমরা।
প্র: লেখক কি বিবেকসম্পন্ন কোনও পৃথক সত্তা?
উ: লেখক একজন মানুষ। বিবেক লিখলেই বিবেকবান নয়। লেখা আর লেখক আলাদা। গ্রেট আর্টিস্ট, গ্রেট রাইটার বাট মিন এরকম অনেক আছে। একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি ও লেখক হিসেবে প্রায় সমমানের। একমাত্র।
প্র: রাজনীতি নিয়ে কিছু জানতে চাই না, আবার এটা বাদ দিয়ে এখন চলা যাচ্ছে না। পলিটিক্স আমাদের গ্রাস করছে।
উ: এখনকার সমাজে এটা বড় সমস্যা। আর এই পলিটিক্যাল আগ্রাসনে আমার খুব আপত্তি। স্বাধীনতাপূর্ব অবস্থা আমি শিশু অবস্থায় দেখেছি। পোস্ট ইন্ডিপেন্ডেন্স, পোস্ট রেভোলিউশন দেখলাম। এখন পোস্ট গ্লোবালাইজ়েশন ইন্ডিয়া দেখে আমার লজ্জা হয়। কালচারালি একেবারে বশ হয়ে গেছি।
প্র: বাংলা ভাষার ভবিষ্যত্‌ নিয়ে কী বলবেন?
উ: কিছু বলার নেই। ভাষা গতিশীল। ভাষা পাল্টায়। কালীপ্রসন্ন সিংহের ভাষা আর হুতোমের ভাষা কত পাল্টে গেল। দুই-ই সাহিত্যের কাজে লাগছে। কিন্তু একটা স্ট্যান্ডার্ড ভাষা থাকা জরুরি, যা দিয়ে সাহিত্য লেখা হবে। আজকালকার ছেলেরা যে-ভাষা ব্যবহার করে, তা ওই হুতোমের ভাষা। মিশ্রিত, অপভাষাবহুল, অপরিশীলিত। ভাল লাগে না। কিন্তু বাদ দিতেও তো পারি না। সংলাপ লিখতে গেলে ওই ভাষা নিতে হবে। খুব বিশুদ্ধ ভাষায় লিখলে সেই সংলাপ কৃত্রিম শোনাবে। আবার সম্পূর্ণ উল্টো দিকে, যখন রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ি, মাঝে মাঝে মনে হয় না বেশি ফেনিয়েছেন?
প্র: হ্যাঁ। প্রবন্ধের ক্ষেত্রে।
উ: কবিতার ক্ষেত্রেও।
প্র: হ্যাঁ। কবিতাতেও।
উ: কিন্তু বঙ্কিমকে মনে হয় না। অদ্ভুত একটা প্লেস নিয়ে আছেন ভদ্রলোক। আজকাল ছেলেমেয়েরা তাঁর লেখার স্বাদ নিতে পারছে না। ওই যে বলছিলাম, বঙ্কিমের কোনও ঘরানা হল না। তাঁর ধারা শেষ হয়ে গেল। শুধু রবীন্দ্রনাথ আর শরত্‌চন্দ্রই রইলেন মূলত।
প্র: বঙ্কিমি ভাষা আয়ত্ত করা কঠিন বলেই কি?
উ: না। ওঁর গ্র্যান্ড স্টাইলটাই আর আয়ত্ত হল না। কমলকুমার নিজস্ব শৈলীতে খানিক নতুনত্ব এনেছিলেন। কিন্তু তিনি বঙ্কিমের উত্তরসূরি নন।
প্র: আর কী কী লেখার ইচ্ছে আছে সাহিত্যিক বাণী বসুর?
উ: বলব না। বললে হয় না। (হেসে)।
প্র: আপনি নিজে কিছু বলুন।
উ: পাঠকদের উদ্দেশে বাণী দিতে চাই না। তুমি জিজ্ঞেস করলে না তো ছোটবেলায় কী কী খেলতাম?
প্র: কী কী খেলতেন? বাড়ির কাছে মাঠ ছিল?
উ: সব খেলতাম। মাঠে নয়। খুব কনজ়ারভেটিভ বাড়ি তো। ছাতে খেলতাম। আসলে অনেকেই ছোটবেলা পড়াশোনা ইত্যাদি ব্যক্তিগত কথা জানতে চান। কেউ কেউ কত রয়্যালটি পাই তা-ও জিজ্ঞেস করেছেন।
প্র: ভাষার কথা কী বলছিলেন?
উ: এখন বর্তমান প্রজন্মের কথাবার্তায় প্রচুর অপভাষা, ভাঙা, আঞ্চলিক ভাষা ঢুকে গেছে। এই ধরণের মস্তানি আমরা হুতোমি ভাষায় পেয়েছি। কিন্তু ওই ভাষা দিয়ে বড় সাহিত্য রচনা হতে পারে না। সত্যিকারের কোনও কনভার্সেশন হয় না। আজকাল সবাই একধার থেকে ‘সাথে’ বলে। জানি না। মনে হয় দূরদর্শনের প্রভাব! আসল কথা স্ট্যান্ডার্ড ভাষা আঞ্চলিকতা মুক্ত হবে। সব ভাষার মধ্যে একটা পরিশীলনের ছাপ থাকবে। ‘সাথে’ আঞ্চলিক, আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার নিয়ে একটা মজার গল্প বলি। একটি ছেলে রোজ একটি সুন্দরী মেয়েকে ধাওয়া করে। তার বন্ধুরা তা নিয়ে তাকে খুব খেপাত। কিছুদিন পর এই ব্যাপারটা বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধুরা স্বভাবতই কৌতূহলী কী ব্যাপার? ছেলেটি তখন বলল, একদিন মেয়েটি ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে, আপনি আমার ঠেঙে কী চান? ব্যস, এইতেই তার প্রেম চটকে যায়। ‘সাথে’র ব্যবহার অনেকটা সেই রকম। ভাল পত্রপত্রিকায় ‘সাথে’ ব্যবহার করলে সে লেখা ছাপা
হয় না।
এক ঘণ্টা বসার কথা ছিল। রাত্রি প্রায় সাড়ে ন’টা। আড়াই ঘণ্টা কথা হল। তবু মনে হল, আরও কত কী জানার ছিল ‘মৈত্রেয় জাতক’-এর স্রষ্টার কাছে। হয়তো জানা হবে। অন্য কোনও দিন।