একটি গ্রাম্য পটচিত্র - সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

| |
একদিন সকাল দশটা-এগারোটায় দিলারাবিবিকে তালাক দিয়ে বসল ইরফান আলি। তিন-চারজন সাক্ষীর সামনে। হ্যাঁ, রাগের মাথায় কাজটা করে ফেলেছে বটে, কিন্তু তুমি হাসতে-হাসতে বললে না চোখ পাকিয়ে চিৎকার করে বললে, শরিয়ত তো তা দেখতে যাবে না। ধর্মের বিধান মানতেই হবে।
হয়েছে কী, দু-দিন আগেই বাড়ির পুকুরধারের বেলগাছ থেকে পাঁচটা পাকা বেল পাড়া হয়েছে। অত বেল কে খাবে? বাড়িতে অতিথ এলে বেলের পানা করে দিলে তারা খুশি হয়। তাতে চায়ের খরচও বাঁচে। সেটেলমেন্ট অফিসের দুজন কর্মচারী, পঞ্চায়েতের সুখেন্দুবাবু আর ইরফানের এক চাচার সঙ্গে কথাবার্তা বলছিল ইরফান। উঠোনে, জামরুল গাছের ছায়ায় বসে। কাজের কথা শেষ হয়ে গেছে, তবু সেটেলমেন্টের বাবু দুটির ওঠার নাম নেই। দুপুরবেলা একবার কোর্টে যেতে হবে ইরফানকে। তাই সে স্ত্রীর উদ্দেশে হেঁকে বলল, দিলু, বেলের সরবত বানিয়েছিস তো সকালে? কয় গেলাস দিয়ে যা।
দিলারা সাড়া দিল না। সে ঘরের মধ্যেই আছে, শুনেছে নিশ্চয়ই।
এই বর্ষায় নদীর ভাঙন হয়েছে খুব। এপারেই ভেঙেছে বেশি, ইস্কুল বাড়িটাও গেছে। চর জেগে উঠেছে ওপারে। সেই চরে এর মধ্যেই জবরদখল শুরু হয়ে গেছে। তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে ক'দিন ধরে। লাঠালাঠি আসন্ন। ওপারে এক দারোগার শালাই দখল নিয়েছে অনেকখানি জমি।
আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর ইরফান আবার হাঁক দিল, কই রে দিলু, সরবত পাঠাইলি না?
গোয়ালঘরের পিছনের জমিতে এবার পেঁয়াজের চাষ করেছে দিলারা। ভালোই কলি উঠেছে। সেখান থেকে মাটিমাখা হাতে বেরিয়ে এল দিলারা। মাথায় ঘোমটাটা টেনে দিয়ে সে বলল, সরবত এখনও হয় নাই।
ইরফান বলল, হয় নাই? তুরন্ত বানায়ে ফেল। মেহমান এসেছে, দেখছিস না?
দিলারা বলল, আমার এখন টাইম নাই। শাহেদরে বলেন।
ইরফান বদমেজাজি মানুষ। বউয়ের এরকম উদ্ধত জবাব তার সহ্য হবে কেন? তা ছাড়া ইদানীং একটা ব্যাপার ঘটেছে, তার জন্য সবাই তার সঙ্গে খাতির করে কথা বলতে শুরু করেছে। শুধু নিজের বউয়ের কাছেই মান বাড়েনি।
ইরফান বলল, তোর টাইম নাই? কী এমন রাজকার্য কচ্ছিস? যা, শিগগির যা।
দিলারা দু-হাতের মাটি পরিষ্কার করতে-করতে বলল, কইলাম তো, আমি এখন পারব না। আগে গোসল না করে—
সে আড়চোখে একবার দেখল ইরফানের চাচা খালেকের দিকে। এই লোকটি এখন রোজ আসে, ইরফান যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, ততক্ষণ মাছির মতন লেপটে থাকে তার গায়ের সঙ্গে।
ইরফান উঠে দাঁড়িয়ে গর্জন করে বলল, তোর বেশি বেশি বাড় বেড়েছে, না? কথা কইলে কানে যায় না, আমার কথা গেরাহ্য করিস না। তুই দূর হয়ে যা! এ বাড়িতে আর ঠাঁই নাই। যাঃ! তালাক—
অন্যরা সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। খালেক দু-হাত তুলে ব্যাকুলভাবে বলল, ওরে ইরফান করিস কী, করিস কী, থাম!
ইরফান সে অনুরোধ অগ্রাহ্য করে আরও দুবার উচ্চারণ করল, তালাক, তালাক!
ব্যাপারটার গুরুত্ব প্রথমটায় ঠিক বুঝতে পারল না দিলারা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মাঝে-মাঝে কোন্দল তো হয়ই, লোকজনের সামনে ফুঁড়ে বেরুলে পীড়া হয় বেশি।
সে আরও ফুঁসে উঠে বলল, ঠাঁই নাই মানে? সারাটা জীবন বাঁদীর মতন খেটে-খেটে মুখে রক্ত উঠে গেল, আপনে আমারে—
হঠাৎ থেমে গেল দিলারা। তালাক শব্দ তিনবার, এবার তার মর্মে আঘাত দিল। নিজের মায়ের মৃত্যুসংবাদ শোনার পর তার যা অবস্থা হয়েছিল, থরথর করে কেঁপে উঠেছিল শরীর, সেইরকম ভাবেই থুপ করে বসে পড়ল মাটিতে, উলটে গেল চক্ষু দুটি।
অপর চারজন স্তম্ভিতের মতন দাঁড়িয়ে পড়েছে। এইরকম সময় তাদের উপস্থিতিরও একটা দায়ভাগ আছে। যেন চোখের সামনে একটা হত্যাদৃশ্য প্রত্যক্ষ করা। বিচারকের সামনে তা স্বীকার করতেই হবে।
সুখেন্দু আর খালেক ইরফানকে কিছু বলতে গিয়েও কথা খুঁজে পেল না, আর তো বোঝাবার কিছু নেই।
বাতাসে এসব কথা নিমেষে ছড়ায়। ছুটে এল পাড়াপড়শিরা।
এ মহকুমায় সুলতানপুর নামেই দুটি গ্রাম আছে। এখানে নদী অনেকটা বাঁক নিয়েছে বলে এ গ্রামের নাম মুখে-মুখে বাঁকা সুলতানপুর। অন্তত দশ বছরের মধ্যে এখনকার কোনও পরিবারে তিন তালাকের মতন ঘটনা ঘটেনি। সেরকম কিছু কারও স্মরণে নেই। কোনও পুরুষেরই বউ নেই একটার বেশি। শুধু মোতাহার মোল্লা এ গ্রামে একটি পরিবার থাকা সত্বেও গোবিন্দপুর গঞ্জে সিরাজ শেখের মেয়ে ফতিমাকে বিয়ে করে গোপনে দ্বিতীয় সংসার পেতেছিল। দু-নৌকোয় পা দিয়ে চালাচ্ছিল কিছুদিন, তবে এসব কথা বেশি দিন চাপা থাকে না। জানাজানি হতেই মোতাহার গ্রাম ছেড়ে পালায়, প্রথম পক্ষের বিবিকে তালাকও দেয়নি, আর এমুখোও হয় না।
হঠাৎ ইরফান আলি এরকম একটা কাণ্ড করে বসল? তাও এত সামান্য কারণে? বেলের সরবত!
জনগণের মধ্যে ফিসফিসানি চলতে লাগল কয়েকদিন। নানান গুজবের মধ্য থেকেও আসল সত্যটা বেরিয়ে আসে। এমন কিছু করতেই তো পারে ইরফান, তার যে নতুন ডানা গজিয়েছে। রাগের মাথায় না ছাই। আগে থেকে ভেবেচিন্তে, কয়েকজন বাইরের লোককে সাক্ষী রেখে সে যাত্রাপালার মতন তেজি গলায় তিনবার তালাক উচ্চারণ করেছে, যাতে কারও বুঝতে অসুবিধে না হয়। দিলারাকে ত্যাগ করার জন্য সে বদ্ধপরিকর।
খোদা যাকে দেন, তাকে ছপ্পড় ফুঁড়েও দেন। ইরফানের এখন সেই অবস্থা।
জমিজিরেত বেশি নেই ইরফানের। বাপ-দাদার জমি শরিকি ভাগাভাগির পর ইরফান পেয়েছে চার বিঘে। দো ফসলি। তাও আমন চাষটা ভালো হয়, পরেরটা তেমন সুবিধের না। সম্বৎসরের খোরাকিটা কোনওরকমে হয়ে যায়। এ ছাড়া বাজারে একটা টেলারিংয়ের দোকান আছে তার। সে দোকানের আয়ও যৎসামান্য। একটাই সেলাই মেশিন, কখনও ইরফান নিজে চালায়, শিবু নামে একটি অল্প বয়েসি ছেলেকেও রেখেছে। লুঙ্গি আর ফতুয়াই সেলাই করে, অন্য বিশেষ কিছু সুবিধে করতে পারে না। পারলেই বা কী হত! বছরদেড়েক আগে একটা রেডিমেড বস্ত্রালয় খুলেছে মহাপাত্ররা দুই ভাই, সে দোকান এখন চলছে রমরমিয়ে। সব কিছুই পাওয়া যায়, দামও একটু সস্তা। কেউ এখন আর ছিটকাপড় কিনে সেলাই করাতে চায় না।
বস্ত্রালয়ের পাশে ছিদামের মুদিখানা, তার পাশে গণেশের চায়ের দোকান। সেই দোকানের বাইরে নুলো নিতাই বসে থাকে একটা টুল পেতে। আর কোনও কাজকর্ম সে পারে না, সে লটারির টিকিট বিক্রি করে। পাশের গ্রাম চর ভাংরাহাটির বাজারে শ্রীকৃষ্ণ গড়াইয়ের বড় লটারির দোকান, নুলো নিতাই তার সাব-এজেন্ট। খ্যানখেনে গলায় নিতাই চায়ের দোকানের খদ্দেরদের টিকিট কেনার জন্য ঝুলোঝুলি করে। অনেক টাকার আশায় সবাই একবার-দুবার পাঁচ-দশ টাকার টিকিট কিনেছে, কিছুই হয় না, টাকাটাই জলে যায়। পাঁচ টাকা-দশ টাকার দামও কম নাকি? এখন আর কেউ কিনতে চায় না। নিতাইকে নতুন লোক ধরতে হয়। বার করতে হয় নতুন-নতুন উপায়।
ইরফান লটারির টিকিট কেনেনি। তার দোকান থেকে নিতাই একটা ফতুয়া সেলাই করার জন্য অগ্রিম দিয়েছিল পাঁচ টাকা। মাল ডেলিভারির সময় বাকি দশ টাকা পরে দেবে বলে যায়। তারপর দেয় না। ইরফান একদিন রূঢ়ভাবে তাড়া দিতে নিতাই কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ভাইডি, বড় টানাটানি যাস্যে, যদি একটা উবগার করো, এই সিকিম লটারির একখান টিকিট তুমি জমা রাখো। এ টিকিটের দাম কুড়ি টাকা, তোমারে কিছুই দিতে হবে না, আর যদি কপালে লেগে যায়, ফার্স্ট প্রাইজ এক কোটি টাকা, তুমি রাজা-বাদশা বনে যাবে। লোকে যে ভাবে কেউ পায় না, তা ঠিক নয় গো। হরিদেবপুরের নবীন সাঁতরা পেয়েছে বিশ লাখ, তারপর ধরো করম শেখ, সেও একবার...
কোনওরকম আশাই করেনি ইরফান, নেহাত নিতাইকে ক্ষমাঘেন্না করে সে টিকিটটা নিয়েছিল। তার ভাগ্যেই শিকে ছিঁড়ল। চর ভাংরাহাটির শ্রীকৃষ্ণ গড়াই নিজে এসে নম্বর মিলিয়ে বলে গেল, সিকিম রাজ্য লটারির থার্ড প্রাইজ পেয়েছে ইরফান আলি, দশ লাখ টাকা!
দশ লাখ? সে যে কত টাকা, সে ধারণাই নেই ইরফান আলির। একের পিঠে ক'টা শূন্য? কোথায়, কত দূরে সিকিম রাজ্য, সেখান থেকে তারা বেছে নিল বাঁকা সুলতানপুরের ইরফান আলিকে! টিকিটটা কোথায় রেখেছিল মনেই ছিল না। একটু খোঁজাখুঁজিতেই পাওয়া গেল অবশ্য।
এই টাকা কীভাবে পাওয়া যায়? সিকিম যেতে হবে?
কত লোক যে কত কথাই বলে। এখন ইরফানের ধারে-কাছে সব সময় বহু মানুষের ভিড়। সবাই উপদেশ আর পরামর্শ দেওয়ার জন্য ব্যস্ত। অনেক কিছুই ইরফানের মাথায় ঢোকে না।
তারপর এল নিখিল মাস্টার। সে শুধু মাস্টার নয়, পার্টি করে, মিছিল করে। বছর পঁয়তিরিশেক বয়েস, ছিপছিপে চেহারা, গলার জোর আছে। সে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে ইরফানকে নিয়ে বসল দর্জিখানার ভেতরে, বাইরের আগল এঁটে দিল।
প্রথমেই সে জিগ্যেস করল, টিকিটখানা কোথায়?
ইরফান সতর্কভাবে বলল, আছে। কিন্তু এখন সঙ্গে নাই।
নিখিল বলল, বেশ। কারওকেই হাতে দেবে না। কেউ দেখতে চাইলেও দেখাবে না। আমাকেও দেবে না। তোমার ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট আছে?
ইরফান দু-দিকে মাথা নাড়ল।
নিখিল বলল, কী করতে হবে, মন দিয়ে শোনো। একশো টাকা দিয়ে ব্যাঙ্কে একটা অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। তার আগে তোমার ফটো তোলাতে হবে। নাম সই করতে জানো?
ইরফান বলল, জানি স্যার। ক্লাস থিরি পর্যন্ত পড়েছি।
নিখিল বলল, ঠিক আছে। ফটো তুলিয়ে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলবে। তারপর ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের হাতে টিকিটটা জমা দেবে। সঙ্গে দু-তিনজনকে নিয়ে যাবে, সাক্ষী থাকবে তারা। স্টেট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার মনোজিৎবাবুকে আমি চিনি, মানুষটা খাঁটি। তিনি টাকাপয়সার সব ব্যবস্থা করে দেবেন। তোমাকে আর কিছু করতে হবে না। হঠাৎ এত টাকা পেয়ে তুমি কী করবে ভেবেছ?
ইরফান চুপ করে তাকিয়ে রইল।
নিখিল বলল, কিছুই কোরো না। যেমন চলছিল তেমনই চালাও। ব্যাঙ্কে টাকা থাক, তুমি একেবারে চেপে থাকো। হঠাৎ পাওয়া টাকা অনেকেরই ভাগ্যে সয় না। হঠাৎই শেষ হয়ে যায়। কত লোক এসে চিলুবিলু করবে। নানান ছুতোয় ভাগ চাইবে। টাকা ওড়াবার কু-পরামর্শ দেবে। ইরফান আলি, মাথা ঠিক রাখো, যে-রকম মোটা চালে চলছিলে, সেই রকমই চালাও, ও টাকা পরে কাজে লাগবে। নানান পার্টির লোক এসে চাঁদা চাইবে, দেবে না। বলবে, এক বছর পর। শুধু একজন লোককে তোমার এখনই হাজারদশেক টাকা অন্তত দেওয়া উচিত, কাকে বলো তো?
ইরফান বলল, দশ হাজার? কারে?
নিখিল বলল, নিতাইকে। তুমি তো দাম দিয়েও টিকিট কেনোনি, নিতাই তোমায় পাইয়ে দিয়েছে, সে গল্প শুনেছি। যদি ও এই টিকিটটা নিজের কাছে রেখে দিত? ও বেচারা অসহায় নিঃস্ব মানুষ, ওকে কিছু দিলে তোমার পুণ্য হবে।
নিখিলের কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করল ইরফান। মাস্টারবাবু তো নিজের জন্য কিছু চায়নি। পার্টির জন্যও চায়নি। যা-কিছু বলেছে, তার ভালোর জন্যই। সত্যি, ব্যাঙ্ক থেকেই তার সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। ম্যানেজারবাবু তাকে দিলেন একটা সাদা রঙের পাস বই, আর একটা নীল রঙের চেক বই। কী করে টাকা তুলতে হয়, তা বুঝিয়ে দিলেন। ইনকাম ট্যাক্স ইত্যাদি কেটেকুটে ইরফানের নামে এখন জমা আছে সাত লক্ষ কুড়ি হাজার চারশো টাকা। তার বাপের জন্মে কেউ এত টাকার স্বপ্নও দেখেনি।
নিতাইকে অবশ্য সে প্রাণে ধরে দশ হাজার দিতে পারেনি। প্রথমবার দশ হাজারই তুলে নিতাইকে দিল পাঁচ। এত বড় একটা কাণ্ডের পর নিজের জন্য কিছু খরচ করবে না, তাও কি হয়? আত্মীয়স্বজনকে একদিন দাওয়াত তো দিতেই হবে, বাড়ির টিউকলটা কতদিন ধরে সারাবার কথা ভাবছিল, এবার না সারালেই নয়! আগে মাঝে-মাঝেই যাকে মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করতে হত, এখন সেই মানুষটির যদি ব্যাঙ্কে সাত লাখের বেশি টাকা থাকে, তা হলে তার চালচলন কি পুরোপুরি অগের মতন হতে পারে? এখন কত মানুষ তাকে খাতির করে কথা বলে। আগে যারা ইরফানকে পাত্তাই দিত না, এখন তারা ইরফানের সঙ্গে চোখাচোখি হলেই দেঁতো হাসি হাসে। ইরফানের কাছ থেকে যাদের কিছুই পাবার আশা নেই, তারাও এখন ইরফানকে সম্ভ্রম দেখায়, টাকার এমনই গুণ। পাঁচজনের মধ্যে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় আগে কেউ তার কথায় আমলই দিত না, এখন অন্যরা হঠাৎ থেমে গিয়ে বলে, হ্যাঁ, ইরফান, তুমি কী বলছিলে? ঠিকই তো বলেছ!
এরকম অবস্থায় পোশাক-পরিচ্ছদ আগের মতন রাখলে চলে? বিড়ির আগুনে তার নীল রঙের কুর্তাটা দু-জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে। পায়ের জুতো কিংবা চটি দেখলেই বোঝা যায় কে চাষাভুষো, কে বাবু শ্রেণির। তাদের সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা দাড়িতে মেহেন্দি লাগায়। সবচেয়ে চমকপ্রদ কাজ করল ইরফান, একদিন গড়বন্দিপুরে গিয়ে চোখের ডাক্তারকে দেখিয়ে চোখে চশমা নিল। সোনালি ফ্রেমের চশমা। তার চেহারা তো মন্দ না, এমন চশমায় তার রূপ খুলে গেল, এখন সে সত্যিকারের বাবু।
সই করে চেক কাটলেই টাকা তোলা যায়, এতে সে বেশ মজা পেয়েছে। মাঝে-মাঝেই সে টুকটাক টাকা তোলে, খুব বেশি না, দু-হাজার পাঁচহাজার। নতুন নোটগুলোর দিকে মুগ্ধভাবে তাকিয়ে থাকে, গন্ধ শোঁকে। আগে হাজার টাকা রোজগার করতে শরীরের রক্ত পানি করতে হয়েছে, আর এখন শুধু ইরফান আলি নামটা লিখলেই যত ইচ্ছে টাকা আসে।
নিখিল মাস্টারের কথা তার মনে পড়ে মাঝে-মাঝে। ঠিকঠাক পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। এখনও ইরফান তো দু-হাতে টাকা ওড়ায় না, কারওকে কিছু দেয়ও না। কেউ এসে বাপের অসুখ, মায়ের অসুখ বলে কেঁদে পড়লে কিংবা টাকা ধার চাইলেও সে বলে, এক বছরের আগে টাকা তোলা যাবে না রে ভাই, আমার উপায় নাই। তাদের টালির ছাদের বাড়িটাতে নতুন রং করার শখ ইরফানের অনেক দিনের, পাছে লোকের চক্ষু টাটায় তাই সে ইচ্ছেটাকে এখনও দমন করে রেখেছে।
নিখিল মাস্টারকে একখান ধুতি আর কুর্তা কিংবা তাঁর মায়ের জন্য একটা শাড়ি পাঠালে কেমন হয়? ইরফান প্রায়ই ভাবে একথা, কিন্তু ওই ভাবনাটুকুই সার। নিখিল মাস্টারের কাছে সে কৃতজ্ঞ ঠিকই, কিন্তু সহসা সে আর তাঁর সামনে যেতে চায় না। দূর থেকে কখনও সে নিখিল মাস্টারকে দেখলে চট করে অন্য দিকে সরে যায়, কেন সরে যায়, তা সে নিজেই জানে না।
বাড়িতে বউয়ের কাছে নতুন করে কিছু খাতির পায়নি ইরফান। সাতাশ বছরের বিবাহিত জীবন, এর মধ্যে সংসারের অনেক দুর্যোগ সামলেছে দিলারা। একসময় ইরফানের বাপ রোগ-ব্যাধিতে শয্যাশায়ী হয়ে ছিল পাক্কা তিন বছর, তখন তার গু-মুত পরিষ্কার করা থেকে সব রকম সেবা তো দিলারাই করেছে, কোনওদিন মুখে রা কাড়েনি। একসময় খুবই খাটতে পারত সে, এতদিনে খাটতে-খাটতে তার শরীরটা ভেঙেছে। এখন আর তার শরীরে রস নেই, শয্যায় সুখ দিতে পারে না। চুয়ান্ন বছর বয়েসে ইরফান এখনও সা-জওয়ান, কিন্তু তার বউ যেন একটা বুড়ি।
শরীরে রস নেই, জিভেও যে একটুও মিষ্টত্ব নেই দিলারার। মেজাজ হয়েছে খিটখিটে। সংসারের কাজ কিংবা স্বামী-সেবার ত্রুটি নেই, বৃষ্টিতে ভিজে ইরফান যখন জ্বর বাধায়, তখন তাকে ওষুধ খাওয়ানো, কপালে জলপট্টি দেওয়া কিংবা রাত জেগে পাখার বাতাস সবই সে করবে, কিন্তু বকুনি দিতেও ছাড়বে না। দিলারার আর একটি অযোগ্যতাও প্রকট, এ পর্যন্ত সে একটিও পুত্রসন্তান প্রসব করতে পারেনি, তিন কন্যাসন্তানের মধ্যে প্রথম দুটি বেশি দিন বাঁচেনি, ছোট মেয়েটির বয়েস সাত বছর। আর তার সন্তান-সম্ভাবনা নেই।
ইরফান এখন বড়লোক হয়েছে, এখনই তো তার ভোগবিলাসের সময়, নইলে টাকা দিয়ে সে কী করবে? টাকা কেউ পরলোকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে না, পাঁচভুতের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েই বা কী হবে? নারীসঙ্গ ছাড়া কি ভোগবিলাস হয়? এই গ্রামের মধ্যে ব্যভিচার চলে না, সবাই সব কিছু জেনে যায়। তাই দিলারাকে তালাক দেওয়ার মতলব ইরফান কিছুদিন ধরেই এঁটে রেখেছিল।
শরীর ভাঙলেও সংসারের সাশ্রয়ের জন্য দিলারা যথাসাধ্য খাটে এখনও। লটারির টাকার মর্ম সে ঠিকমতন বোঝেনি। ইরফান তাকে দেয়নি নতুন কিছু। দিলারা বাগান-চাষ ভালোবাসে, বাড়ির মধ্যে যেটুকু জমি তাতেই সে বেগুন-মুলো ফলায়, লেবু আর লঙ্কা গাছ আছে, ফুলকপিও করেছিল গত শীতে, এখন সে পেঁয়াজ নিয়ে মেতেছে। ইরফান জানত, সকালবেলা বাগানের কাজ ছেড়ে দিলারা সহজে আসবে না, শাহেদ নামে বাড়িতে একটা আশ্রিত ছেলে আছে, ফাইফরমাস খাটে, তাকে সে বেলের সরবত বানাতে বলতে পারত না? ও বানাতে আর এমনকি গুণ লাগে? লোকজনের সামনে সে দেখাল যে তার বউ তার কথার অবাধ্য, চোপা করে, তাই রাগের মাথায় সে তিন তালাক উচ্চারণ করলে তা কি দোষের হয়?
তালাক তো হয়ে গেল, এরপর সাতবছরের মেয়ে তিন্নিকে নিয়ে দিলারা যাবে কোথায়? তার তিন কুলে আর কেউ নেই। বাপের বাড়ির গুরুজনরা সবাই মরে-হেজে গেছে। সাতাশ বছর ধরে সে এখানে আছে, পুরুষরা বেশির ভাগ সময়ই বাড়ির বাইরে থাকে, মেয়েরাই ধরে রাখে সংসারের শ্রী। এ সংসার ছাড়া দিলারা আর কিছুই জানে না, চেনে না। তালাক হয়ে গেলে স্বামীর বাড়ির অন্ন গ্রহণ করাও নিষিদ্ধ। মেয়েকে নিয়ে যেতে হবে এতিমখানায়? সেটাই বা কত দূরে?
ঘরেই আর ঢুকল না দিলারা। ফোঁপাতে-ফোঁপাতে পুকুরধারে গিয়ে একটা অশথগাছের তলায় বসে রইল। তিন্নি খেলতে গিয়েছিল এক ফুফাতো বোনের সঙ্গে। কেউ তাকে বাড়িতে দিয়ে গেল। মা কেন গাছতলায় বসে কাঁদছে, তা সে বুঝলই না।
দুপুরবেলা শাহেদ এসে দিয়ে গেল এক থালা ভাত, ডাল আর লাউঘণ্ট।
দিলারা থালাটা দূরে ঠেলে দিল। তাকিয়ে রইল সেদিকেই। তার সাতাশ বছরের সংসার কয়েকটা মাত্র শব্দে শেষ হয়ে গেছে, তার সাতাশ বছরের স্বামী আর তার স্বামী নয়, তা হলে এই অন্ন সে মুখে তুলবে কোন অধিকারে?
শুধু একবার চকিতে তার মনে প্রশ্ন জাগল, লাউঘণ্টটা রান্না করল কে? শাহেদ নাকি? ও রান্নার কী জানে? ওই লাউঘণ্ট ইরফানের মুখে রুচবে? রান্নাবান্না নিয়ে তার বেশ নাকছাঁটা আছে। বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ হয়ে গেলে মাছের ঝোল মিঠা হয়ে যায়, তা ইরফান খাবেই না, মেজাজ দেখাবে!
এইভাবেই কেটে গেল দু-দিন।
তিন্নি মায়ের কাছে এসে বসে থাকে, মাঝে-মাঝেই জিগ্যেস করে, আম্মু তোর কী হয়েছে? ঘরে যাইস না কেন?
উত্তর দেয় না দিলারা, এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে মেয়ের মুখের দিকে। এত মুখরা ছিল সে, এই দু-দিন মুখ দিয়ে একটাও শব্দ বার করেনি, যেন তার বার্ধক্য হয়ে গেছে।
কন্যাসন্তান সংসারে অবাঞ্ছিত। তাই মেয়েকে প্রকাশ্যে এখনও স্নেহ-মমতা দেখায়নি দিলারা, সেসব যেন সে ভুলেই গেছে। মাঝে-মাঝে শাহেদ এসে তিন্নিকে প্রায় জোর করেই বাড়িতে নিয়ে যায় ইরফানের আদেশে। তিন্নি বাবাকে কিছু বলতে সাহস পায় না, বাবাকে সে ভয় পায়।
পাড়া-প্রতিবেশিনীদের মধ্যে দুজন নারী দিলারাকে তাদের বাড়িতে আশ্রয় দিতে চায়, তাতেও সাড়া দেয় না সে। এরা দয়া দেখাতে চায়, ভালো কথা, কিন্তু কতদিন দয়া বজায় থাকবে? দিলারা মুখ ফিরিয়ে থাকে।
বাড়িতে টিউকল চালু হয়েছে। ইরফান আর গোসল করার জন্য পুকুরঘাটে আসে না।
অশথগাছটায় অনেক পাখির বাসা। পাখিরা ডাকাডাকি করে, ফুরুৎ করে উড়ে যায়। আবার এসে বসে। মনে হয় যেন, দিনাগত রাতে, আবার দিনে এক ভাবে ঠায় বসে থাকা এই স্ত্রীলোকটিকে দেখে তারা বেশ অবাক হয়েছে। অবশ্য পাখিদের চোখের পাতা থাকে না বলে এমনিতেই তাদের দৃষ্টিতে সবসময় বিস্ময়ের ভাব থাকে। কিংবা হয়তো সেই জন্যই এই দুনিয়াটাকে তাদের প্রতিনিয়ত বিস্ময়কর স্থান বলে মনে হয়।
যখন দুপুর একেবারে শুনশান, কাছাকাছি কেউ থাকে না, তখন দিলারা চোখের জল মুছে পাখিদের দেখে। ওরা ইচ্ছে মতন যেখানে খুশি উড়ে যেতে পারে। কখন কোন গাছের ডালে বসবে তারও কিছু ঠিক-ঠিকানা নেই।
তালাক দিয়েছে বটে, কিন্তু ইরফান তো সম্পূর্ণ হৃদয়হীন মানুষ নয়। বাড়ির কাছেই গাছতলায় বসে আছে তার প্রাক্তন স্ত্রী, এক দানা অন্ন মুখে দেয়নি, এ সংবাদ শুনে তো সে বিচলিত বোধ করবেই। আকাশে মেঘ জমছে, দু-একদিন পরেই শুরু হয়ে যাবে বৃষ্টি, তখনও সে ওখানেই বসে থাকবে?
খালেকচাচাকে সঙ্গে নিয়ে সে এসে দাঁড়াল গাছতলায়।
গম্ভীর গলায় সে বলল, শোনো তিন্নির মা, এইভাবে পুকুরধারে তোমার বসে থাকা মোটেই শোভা পায় না। আমিনাভাবী তোমাকে তাঁর বাড়িতে ঠাঁই দিতে চেয়েছিলেন, তাও তুমি যাও নাই। হাকিমপুরে তোমার খালাতো ভাই সিরাজুল থাকে, তার বড়া গোস্তের কারবার ভালোই চলে, যদি সেখানে যেতে চাও শাহেদ তোমাকে পঁহুছিয়ে দিয়ে আসবে, অথবা—
এবারেই প্রকাশ পেল তার আসল উদারতা। তার দেনমোহন দেবার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই, তবু সে বলল, অথবা বাজারে আমার যে টেলারিংয়ের দোকান আছে, সেটা তুমি নিতে পার। পিছনের কুঠুরিতে থাকার জাগা হয়ে যেতে পারে। দোকান তুমি চালাও, আমি লাভের বখরা নিতে যাব না। দোকান তোমার। মেশিনের নীচে এক দেরাজে দুই শত তিরিশ টাকা আছে, তা দিয়ে প্রথম খরচ চালাবে। এই নাও চাবি—।
মাটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে রইল দিলারা, একবারও সে তাকায়নি আর সাতাশ বছরের স্বামীর দিকে। কোনও সাড়াশব্দও করল না।
দু-তিনবার একই কথা বলার পর চাবিটা ছুড়ে দিয়ে চলে গেল ইরফান।
পরদিন ভোরবেলা পুকুরে জল সইতে এসে পল্লির নারীরা দেখল, অশথগাছের ডালে ঝুলছে দিলারার নিস্পন্দ শরীর। অনেকগুলি পাখি ডাকাডাকি করছে এ-ডালে ও-ডালে। এই সময় তো পাখি ডাকেই।
প্রতিবেশিনীদের অনেকেই মনে করল, দিলারা ঠিক কাজই করেছে। শুধু-শুধু ঝঞ্ঝাট বাড়িয়ে লাভ তো কিছু হত না। বাজারের দোকানঘরে কি কোনও স্ত্রীলোক থাকতে পারে? গোসল করবে কোথায়?
এই সব মানুষদের স্মৃতি বড় তাড়াতাড়ি মুছে যায়। ছবিটবি থাকে না, কোনও চিহ্নও থাকে না বলতে গেলে। শুধু দিলারার যত্ন করা পেঁয়াজকলিতে পেঁয়াজ হয়, বেগুনে গত্তি আসে, মাচা থেকে দুলতে থাকে কচি-কচি শশা। সেসব খাওয়াও হয়ে যায়।
প্রথম কয়েকটি দিন তিন্নিকে নিয়ে রেখেছিল পাড়ার বউরা। সমবয়েসি পেয়ে মেয়েরা খেলাধুলোয় তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে রেখেছে। তারপর তো বাড়ির মেয়েকে বাড়ি ফিরতেই হবে। মেয়েটার স্বভাব বড় ছটফটে, এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসতেই পারে না, একটু ফাঁক পেলেই বাড়ির বাইরে দৌড়ে চলে যায়। অথচ পড়াশুনোতে মাথা আছে। এর মধ্যেই আঁক কষতে শিখেছে, বাংলাও পড়তে পারে, যুক্তাক্ষরের বানান ভেঙে-ভেঙে। গ্রামের ইস্কুলটি গতবার গেছে নদীগর্ভে, এখন মসজিদের পিছনে হোগলার ছাউনি দেওয়া খানিকটা জায়গায় ক্লাস হয়, সেখানে যেতে তিন্নির খুবই উৎসাহ। কিন্তু তারপর আর বাড়ি ফিরতে যেন ইচ্ছেই করে না।
দিলারার ইন্তেকালের ঠিক পাঁচ মাস পর ইরফান শাদি করল লায়লা অঞ্জুমান বানুকে। তার চেয়ে প্রায় কুড়ি বছরের ছোট, ফরসা হিলহিলে চেহারা, সারা শরীর দিয়ে লাবণ্য যেন ঝলকে-ঝলকে পড়ছে। পাতলা ঠোঁটে সব সময় দেখন-হাসি। এই উপলক্ষে গ্রামসুদ্ধু সবাইকে ভোজ দিল ইরফান, পিরের মাজারে চাদর চড়াল।
এ বিয়েতে গ্রামের মানুষ বেশ খুশি। অন্যায় তো কিছু নেই! আগের স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ন্যায্য অধিকার আছে ইরফানের। তার সঙ্গে বনিবনা না হলে আর কী উপায়। উত্তরাধিকারীও উপহার দিতে পারেনি সে। তার খোরপোষেরও ব্যবস্থা করেছিল ইরফান, সে সুখ তার কপালে সইল না, তাতে আর কী করা যাবে! তা বলে ইরফান কেন তার জাগতিক সুখ থেকে বঞ্চিত হবে! আগের অবস্থায় সে এমন সুন্দরী যুবতীকে বউ করে ঘরে আনলে লোকে বলতে পারত গরিবের ঘোড়া রোগ, কিন্তু এখন সে এ-তল্লাটের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। টাকা থাকলে কত রকম সুখই তো কেনা যায়!
লায়লাকে সবারই খুব পছন্দ, তার সরল-সরল কথা শুনতে বেশ মজাই লাগে। তবে তার বাপের বাড়ির লোকেরা মাঝে-মাঝে এসে বড় উৎপাত করে। লায়লা এরকম ধাদ্ধারা গোবিন্দপুরের মেয়ে নয়, তার বাড়ি গঞ্জ অঞ্চলে, বিশাল একান্নবর্তী পরিবার, নানারকম সম্পর্কের ভাই-বোনের সংখ্যাও অনেক, তারা তো নতুন দুলাভাইয়ের বাড়িতে আসতেই পারে। প্রায়ই তারা আসে মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে, একবার এল একটা সাদা রঙের গাড়ি ভাড়া নিয়ে সাত-আটজন। এখানে নদীর পাড় ভাঙছে, ভেঙেই চলেছে, সেটাই নাকি একটা দর্শনীয় ব্যাপার।
তরুণী ভার্যার মনোরঞ্জনের জন্য পুরুষ মানুষ কী না করতে পারে। এর মধ্যে মুঠো আলগা করেছে ইরফান। নিখিল মাস্টারের উপদেশ আর তার মনে পড়ে না। ঘনঘন টাকা তোলে ব্যাঙ্ক থেকে। এর মধ্যে একটা পাকা দালান বানানো হয়েছে, নদীর খেয়াঘাটে ডাক দিয়ে পারানি কিনেছে এক বছরের জন্য। এক লপ্তে দশ বিঘে জমি কেনারও কথাবার্তা চলছে। লায়লার দুই ভাই-ই এখন তার প্রধান পরামর্শদাতা।
এ বাড়ির চেহারাই পালটে গেছে এখন। প্রতিদিনই জমজমাট ভাব। লায়লার বাপের বাড়ির থেকে রান্নার জন্য একজন মেয়েলোক আনানো হয়েছে, তার নাম সেতারা। লায়লাকে সে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে, এখন বয়েস হলেও শরীরে যথেষ্ট তাগদ, এক হাতে সে কুড়ি-পঁচিশ জনের খাদ্যদ্রব্য পাক করে ফেলতে পারে অনায়াসে।
বাড়িতে এক সঙ্গে এত মানুষ দেখলে তিন্নি মাঝে-মাঝে ঘাবড়ে যায় বটে, কিন্তু তার কোনও অযত্ন হয় না। লায়লা প্রথম থেকে তাকে সুনজরেই দেখেছে। তার নিজের মধ্যেই একটা বালিকা-ভাব আছে এখনও। সৎমা শুনলেই কেমন যেন হিংসুটি, ভয়ঙ্করী মনে হয়, লালয়ার মধ্যে সেরকম ভাব একটুও নেই। সে নিজে গঞ্জের স্কুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে, তিন্নিকে সে পড়াতে বসায় বিকেলবেলায়। ছড়া শেখাবার সময় দুজনে একসঙ্গে ছড়া বলে। মাঝে-মাঝে দুজনেই এক সঙ্গে হেসে গড়িয়ে পড়ে।
লায়লার দুই ভাই খালেক আর বদন, এর মধ্যে বদনের স্বার্থবুদ্ধি বেশি, আর খালেক অনেক দিলখোলা। তিন্নি সম্পর্কে এদের মনোভাবও বিপরীত।
ইরফানের স্নেহ-বাৎসল্য বোধ কম, সে মেয়েকে নিয়ে কখনও আদিখ্যেতা করেনি, সে আছে, ঘোরে ফেরে, খায় দায়, ইরফান দেখে, সেটাই যথেষ্ট।
কারও-কারও স্নেহ-ভালোবাসা হয় বড় বেশি একমুখী। সেতারার নিজের সন্তানাদি নেই, বালবিধবা, দ্বিতীয়বার আর নিকে হয়নি, সব স্নেহ সে উজাড় করে দিয়েছে লায়লাকে। লায়লার শ্বশুরবাড়িতেও সে এসেছে স্বেচ্ছায়, তাকে সে চোখে হারাতে চায় না। শ্বশুর-শাশুড়ির ঝামেলা নেই, লায়লা এখানে সুখের রাজত্ব গড়বে, পাশে থাকবে সেতারা। কিন্তু এর মধ্যে তিন্নির স্থান কোথায়?
প্রথম-প্রথম কয়েকদিন সে তিন্নির ওপর নজর রাখে। বাচ্চা মেয়েটার মধ্যে সে দোষের কিছু দেখতে পায় না। শুধু ওর অস্তিত্বটাই দোষের। ও না থাকলেই তো ভালো ছিল। প্রথম-প্রথম সে ভাবত, আছে তো থাক না, ওর খাওয়াপরার কতই বা খরচ-খরচা লাগে। কিন্তু ও মেয়ে তো বড় হবে, তখন ওর দাবিও বাড়বে। ও যদি লায়লার সমান হতে চায়? তারপর অবস্থা অনুযায়ী মানানসই শাদি দিতে হবে, সেও বহু টাকার ধাক্কা। ওর স্বামীটাই বা কেমন হবে, যদি একটা চশমখোর হয়? যদি সে ভালোমানুষ ইরফান মিঞাকে নিত্য শোষণ করে?
এখনও আট বছর বয়েস হয়নি তিন্নির, তবু তার দিকে তাকিয়ে সেতারাবিবি অনেক দূর পর্যন্ত দেখে ফেলে। ভয়ে তার শিহরণ হয়। এখন যে বাচ্চা মেয়েটি হাসছে, খেলছে, দৌড়োদৌড়ি করছে, কয়েক বছরর পরে এ মেয়েই হবে হিংস্র বাঘিনী। লায়লার জীবন বিষময় করে দেবে। লায়লারও নিজের সন্তান হবে, তাকে বঞ্চিত করবে এই মেয়ে।
এইসব আশঙ্কার কথা সেতারা অনবরত লায়লার কানে ঢালতে লাগল। প্রথম-প্রথম লায়লা বিরক্ত বোধ করত। কী সব অলুক্ষুণে কথা, তিন্নি বেশ মেয়ে। কিন্তু দিনের-পর-দিন একই কথা শুনলে ক্রমশ বিশ্বাসযোগ্যতা এসেই যায়। ইরফানের গোচরেও যায় এই বৃত্তান্ত। ইরফান কোনও মন্তব্যই করে না। যৌবনের স্বাদ পেয়ে সে এখন উন্মত্ত, লায়লা একদিন সামান্য একটু মুখ ভার করলেই সে নতুন শাড়ি-গয়না কিনে আনে।
কয়েক মাসের মধ্যেই পোয়াতি হল লায়লা। খবরটা দেওয়ার সময় মসজিদে এক হাঁড়ি রসগোল্লা বিলি করল ইরফান। তার দৃঢ় ধারণা, এবার সে পুত্রসন্তান পাবে। শুধু সম্ভোগ নয়, লায়লা তার সৌভাগ্যও এনে দেবে, তার বংশরক্ষা হবে।
বউকে নিয়ে মাঝে-মাঝে নদীতে বেড়াতে যায় ইরফান। সন্ধের পর খেয়া চলে না। নৌকোর মালিক এখন ইরফান নিজে। মাঝি ইদ্রিশ রাত্রিবেলা তার বাড়িতেই খায়, সুতরাং তাকে দিয়ে বেশি কাজ করানোও যায়। প্রতিদিন নদী পারাপার করে ইদ্রিশ, এই নদীই নবিগঞ্জে তার বাড়ি খেয়ে নিয়েছে। তার বউ এখন বাপের বাড়িতে মুখঝামটা খেয়েও বাধ্য হয়ে তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকে। ছেলেটার আবার পোলিও।
এক বিকেলে সেজেগুজে বেরুবার সময় লায়লা বলল, আয় তিন্নি, তুইও চল আজ আমাদের সঙ্গে। শাড়ি পরবি? আমি তোকে শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছি। লখার মাঠে আজ সিনেমা দেখাবে, তুইও দেখবি বেশ।
তিন্নিকে শাড়ি পরিয়ে, গালে পাউডার মাখিয়ে, কপালে টিপ লাগিয়ে সাজিয়ে দিল লায়লা। অনভ্যস্তভাবে পুতুলের মতন পা ফেলে-ফেলে বাবা-মায়ের সঙ্গে চলল তিন্নি। আকাশে অল্প-অল্প মেঘ, তবে সহসা ঝড়ের সম্ভাবনা নেই। আর ঝড় উঠলেও সামাল দিতে পারবে ইদ্রিশ।
ভরা বর্ষার নদী, ফনফন করছে পানি। সারা শীতকাল আর গ্রীষ্মকাল এ নদী না খেয়ে উপোসী হয়ে থাকে, চেহারা হয়ে যায় শুকনো দড়ির মতন, কিংবা শয্যাশায়ী মুমূর্ষুর মতন। এখন এই কয়েকটা মাস তার সারা অঙ্গে যৌবনতরঙ্গ। আর যৌবনে খিদেও হয় সাঙ্ঘাতিক। অনবরত পাড় খায়, গাছপালা, বাড়ি-ঘর সমেত ভূমি গ্রাস করে নেয়। তবে শুধু এক দিকের পাড় খেয়ে তার আশ মেটে না, স্বাদ বদলের জন্য দু-তিন বছর পর আবার অন্য পাড় খায়। সেখানকার মাটির স্বাদ বুঝি আলাদা।
সন্ধে হয়-হয়, বদর-বদর করে ইদ্রিশ নৌকো ছেড়ে দিল। এরই মধ্যে চাঁদ উঠেছে, মেঘের ফাঁকে-ফাঁকে লুকোচুরি খেলছে। পাশাপাশি বসেছে ইরফান আর লায়লা। আজ ইরফান পরেছে সিল্কের সবুজ কুর্তা আর মাথায় ফেজটুপি, আর টুকটুকে লাল শাড়ি পরা লায়লা যেন সাক্ষাৎ এক হুরি, খোঁপায় গুঁজেছে সাদা ফুল। কী সুন্দর মানিয়েছে দুজনকে। তিন্নি একবার এদিক আর একবার ওদিকে মুখ ফিরিয়ে দেখছে নদীকে। বৈঠার আওয়াজের সঙ্গে-সঙ্গে পাড় ভাঙার অনবরত ঝুপ-ঝুপ শব্দও শোনা যায়।
খানিক বাদে লায়লা বলল, তিন্নি একটা ছড়া বল না। সেই শেয়াল পণ্ডিতের ছড়াটা।
তিন্নির লজ্জা হয়েছে, সে মুখ খোলে না। ফিকফিক করে হাসে। সে আজ সিনেমা দেখবে, আর কত লোক দেখবে তার শাড়ি পরা চেহারা।
ফিরতে রাত হবে, তাই সঙ্গে আনা হয়েছে পরোটা আর আলুভাজি। খানিক বাদে খাওয়া হল সেসব। লায়লা যত্ন করে তিন্নিকে খাওয়াল, বলল, আর একটা পরোটা নে তিন্নি, এই তো এত ভাজি রয়েছে, কে খাবে? নে, নে!
কয়েক বোতল ভরতি পানিও আনা হয়েছে, তাতেই হাত ধুয়ে খানিকটা গলায় ঢেলে নিল ইরফান আর লায়লা। তিন্নি হাত ধোয়ার জন্য ঝুঁকে নদীতে হাত ডোবাল।
তখনই একখণ্ড কালো মেঘ ঢেকে দিল চাঁদটাকে। একেবারে আঁধার হয়ে গেল চারিদিক।
ইরফান ফিসফিস করে বলল, দে ইদ্রিশ, এবার।
ইদ্রিশ পানি থেকে বৈঠা তুলে খুব জোরে একটা ঘা মারল তিন্নির ঘাড়ে। তারপর পাছার তলায় হাত দিয়ে ঠেলা মারল। তিন্নি উলটে পড়ে গেল নদীতে। গুপুস করে একটা শব্দ হল শুধু।
তারপর কিছুক্ষণ তিন জনই নিশ্চল। নৌকোও স্থির। কোনও শব্দ নেই। কালো মেঘটা সরে গিয়ে আবার ফুটল একটু ফ্যাকাসে জ্যোৎস্না। দূরে-দূরে দেখা যাচ্ছে আর কয়েকটা নৌকোর আলোর বিন্দু। মেয়েটা একেবারে তলিয়েই গেছে।
ওইটুকু একটা প্রাণ, গেল কী থাকল, তাতে পৃথিবীর কী-ই বা আসে যায়। এমন তো কতই যায় হর রোজ। তিন্নির জন্য শোক করার কেউ নেই, বরং সে ডুবে গিয়ে কিছু মানুষের জীবনে স্বস্তি এনে দেবে।
কিন্তু হঠাৎ অন্য রকম প্রতিক্রিয়া হল লায়লার।
নৌকো যখন লখার মাঠের কাছাকাছি এসে গেছে, দেখা যাচ্ছে সিনেমাওয়ালাদের আলো, শোনা যাচ্ছে উৎসুক জনতার মৃদু গুঞ্জনধ্বনি, সেই সময় লায়লা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, মেয়েটাকে খতম করে দিলে, অ্যাঁ? সিনেমা দেখবে, কত আশা করেছিল, হায় আল্লা, এ কী করলে তোমরা?
পরিকল্পনাটা সবই জানত লায়লা, সে সম্মতি জানিয়েছিল, এখন সে দুষতে লাগল তার স্বামী আর ইদ্রিশকে! শুধু তাই নয়, সে এমনই বিকৃত গলায় চিৎকার করতে লাগল যে তাকে সামলানোই এখন কঠিন। ইরফান তাকে জড়িয়ে ধরলেও সে ছিটকে সরে যেতে চায়। সর্বনাশ, এখন জানাজানি হলেই যে সকলের হাতে দড়ি পড়বে। লায়লাও ছাড়া পাবে না।
সিনেমা দেখার আর প্রশ্নই ওঠে না, নৌকোর গলুই ঘুরিয়ে দিল ইদ্রিশ। লায়লাকে জোর করে শুইয়ে তাকে চেপে ধরে রইল ইরফান, পাশ দিয়ে দু-একটা নৌকো যাচ্ছে, তারা কেউ অবশ্য লায়লার গোঙানি শুনতে পায়নি।
ফিরে আসা হল ভালোয়-ভালোয়। ঘাটে নেমে নিজেই খুব চেঁচিয়ে কান্না শুরু করল ইরফান। এখন সব লোককে জানান দিতে হবে। বাড়িতে এসেও শুরু হল কান্নার রোল, সেতারাও যোগ দিল তাতে। এটাই নিয়ম, মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে সকলকেই কান্নার জোকার তুলতে হয়।
দু-দিন পর এ বাড়িতে এলেন পুলিশের দারোগা নিয়ামত খান। এ গ্রামে থানা নেই, দারোগা এসেছেন নবিগঞ্জ থেকে। নিয়ামত খানের দশাসই চেহারা, বদমেজাজি, সবসময় মুখে পান। সবাই জানে, এ দারোগা যেমন ঘুষখোর, তেমনই স্বেচ্ছাচারী। সরকার কিংবা সংবিধান থাকেন অনেক দূরে, এখানকার পুলিশদের ওপরওয়ালা কেউ নেই, এখানে কর্তার ইচ্ছেতেই সব কর্ম হয়।
উঠোনেই একটা কুর্সি পেতে দেওয়া হল নিয়ামত খানের জন্য। মুখ ভরতি পান, তবু তিনি একটা সিগারেট ধরালেন। দিলারার আত্মহত্যার পরও তিনি একবার এসেছিলেন, নিয়মরক্ষার জন্য আসতেই হয়। তখন বে-আইনি কিছু পাননি, তবে কোনও বাড়িতে এলেই কিছু প্রণামী তার পাওনা হয়, তা পেয়েছিলেন, ঠিকঠাক রিপোর্ট দিয়েছিলেন।
এবারের ঘটনা একটু আলাদা।
গ্রামের আর দশ জনের মধ্যে যে একজন, সে যদি হঠাৎ আঙুল ফুলিয়ে কলাগাছ হয়, তবে তার সম্পর্কে অন্য ন'জনের রাগ কিংবা ঈর্ষা হবে না? এটাই তো মানুষের স্বভাবধর্ম। তাও লোকটির ব্যবহার না বদলালে অন্যরা মেনে নিতে পারত, কিন্তু বিনা উপার্জনের সম্পদে বিষ থাকবেই। সেই বিষে মাথা বিগড়ে দেয়। চতুর্দিকে এখন আলোচনা চলছে, ইরফান আর লায়লা নিজে তাদের আগের পক্ষের মেয়ে তিন্নিকে খুন করেছে। সরিয়ে দিয়েছে পথের কাঁটা।
এরকম জনমতের চাপে পুলিশকে কিছু করতেই হয়। তাই তো এসেছেন নিয়ামত খান। কিন্তু তিনি অনুত্তেজিত। ডাকাতি নয়, দু-চারটে লাশ পড়ে যাওয়ার ব্যাপার নয়, একটা বাচ্চা মেয়ের উধাও হওয়ার ঘটনা, তার জন্য আর কত সময় দেওয়া যেতে পারে।
উঠোনের কুর্সিতে বসে সিগারেট টানতে-টানতে নিয়ামত খান ইরফানকে জিগ্যেস করলেন, বলো দেখি বৃত্তান্তটা। সন্ধে থেকে পরপর কী হল?
এর মধ্যে অন্তত একশোবার মনে-মনে ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেছে ইরফান। প্রথম রাত্তিরে সে তো ঘুমোতেই পারেনি। সুতরাং বর্ণনা দিতে ইরফানের কোনও অসুবিধে হল না।
মাঝে-মাঝে মাথা নাড়তে লাগলেন নিয়ামত খান। যেন তিনি সব বুঝতে পারছেন। একটা দুরন্ত ছটফটে মেয়ে বেশি ঝুঁকেছিল নদীর পানিতে হাত ডুবিয়ে, সে তো পড়ে যেতেই পারে। এরকম দুর্ঘটনা মাঝে-মাঝেই ঘটে। বর্ষার নদীতে সকলকেই সাবধান হতে হয়। এ কেসে বাপ-মায়ের কোনও ক্রিমিনাল অফেন্স তো প্রমাণ করা যায় না।
নিয়ামত খান ভোজনরসিক, তাঁর জন্য খাঁটি ঘিয়ের বিরিয়ানি রান্না করে রেখেছে সেতারা। সেই বিরিয়ানির প্লেট দেওয়ার আগে দারোগাবাবুর হাতে একটি মোটা খাম দিল ইরফান। খামটা একবার খুলে দেখলেন নিয়ামত খান, মনে হল হাজার দশেকের নোট। তিনি মৃদু হেসে খামটা রাখলেন প্যান্টের পকেটে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল ইরফান।
মুখ তুলে উদারভাবে নিয়ামত খান বললেন, ইরফান সাহেব আপাতত আপনাদের নামে কোনও কেসই দাঁড়ায় না। তবু একবার আপনার বিবির সঙ্গে কি কথা বলা যেতে পারে?
ইরফান বলল, হজুর সেদিন থেকে আমার বিবি শয্যাশায়ী। খুব ভালোবাসতেন তো মেয়েকে। কারও সঙ্গে বাতচিৎ করছেন না, শুধু কাঁদছেন। তবু যদি আপনি চান—
নিয়ামত খান হাত তুলে বললেন, থাক, থাক। এরকম সময় জেরা করা খুবই ইনহিউম্যান, বুঝতেই তো পারছি তাঁর মনের অবস্থা। থাক, থাক।
তারপর তিনি নীচু গলায় বললেন, ইরফান সাহেব, এখন কয়েকটা দিন বাড়ি থেকে আর নাইবা বেরোলেন। চুপচাপ থাকুন। পাড়ার লোক নানা কথা বলবে, কান দেবেন না।
উঠে দাঁড়িয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও তিনি থেমে গেলেন। হঠাৎ মনে পড়ার মতন তিনি বললেন, ইদ্রিশ আলি গেল কোথায়? তার সঙ্গে যে একটু কথা বলতে হয়।
ইদ্রিশ ডিউটি দিচ্ছে খেয়াঘাটে। দারোগা নির্দেশ দিয়ে গেলেন, সে যেন এক ঘণ্টার মধ্যে থানায় গিয়ে হাজিরা দেয়।
আকাশ কাঁপিয়ে বাজ ডেকে বৃষ্টি নামল একটু পরে। খবর এল, নদী দুটো তালগাছ খেয়েছে এক ঘণ্টা আগে। একটা আখের খেতেরও যায়-যায় অবস্থা। নদীর বুঝি এখন মিষ্টি খাবার সাধ হয়েছে। বাধা দেওয়ার কোনও উপায়ই নেই।
মাথায় একটা টোকা দিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই ইদ্রিশ যখন থানায় পৌঁছোল, তখন দারোগাবাবু অফিসঘরে টেবিলের ওপর দু-পা তুলে চুরুট টানছেন। দোক্তাপান, সিগারেট, চুরুট এরকম একটা কিছু তামাকের নেশা তাঁর সব সময় লাগে। চুরুট টানতে-টানতে মাঝে-মাঝে ভালো লাগার আবেশে তাঁর চোখ বুজে আসে।
ইদ্রিশের আপাদমস্তক দেখার পর তিনি নরমভাবে বললেন, তুমি ঘাটোয়াল ইদ্রিশ মিঞা। আগে কখনও দেখিনি। তোমাদের তো বড় পরিশ্রমের কাজ। বসো, বসো, মিঞা। তোমাকে আমি বেশিক্ষণ আটকাব না। সেইদিন সন্ধের পর ঠিক কী-কী ঘটেছিল পর পর বলে যাও তো! আমাকে তো রিপোর্ট লিখতে হবে!
দু-দিন সময় পাওয়া গেছে, এর মধ্যে ইদ্রিশ আর ইরফান অনেকবার ঠিক করে নিয়েছে, যাতে দুজনের বয়ানে কোনও অমিল না থাকে। ইদ্রিশের বুদ্ধি তেমন তীক্ষ্ণ নয়, তা সে পুরো বিবরণটি প্রায় মুখস্থ করে নিয়েছে। তোতাপাখির মতন গড়গড় করে বলে গেল সব।
মাঝপথে একবারও বাধা দিলেন না নিয়ামত খান। যেন তিনি সন্তুষ্ট। এবার নিশ্চিন্ত রিপোর্ট দিয়ে দিলেই হয়। কিন্তু তিনি চুরুটটা নিভিয়ে সোজা হয়ে বসলেন। ইরফানকে তিনি কোনও জেরা করেননি, কিন্তু ইদ্রিশের কাছে একই কাহিনি শোনার পর তিনি জিগ্যেস করলেন, ইদ্রিশ সাব, একটা বাচ্চা মেয়ে পানিতে তলিয়ে গেল, আর আপনারা তাকে বাঁচাবার কোনও চেষ্টা করলেন না? লোকে তো এই কথা জানতে চাইবেই।
ইদ্রিশ উত্তেজিত হয়ে বলল, চেষ্টা করিনি? কী বলছেন সাব! আমি মেয়েটারে ধরবার জন্য তৎসাথেই নদীতে লাফ দিয়েছি। খানিক দূরে রতন সাউয়ের না ছিল, আমার হাঁক শুনে সে কাছে আসে। সে সব জানে। তাকে জিগ্যেস করবেন সার।
নিয়ামত খান বললেন, আপনি নদীতে লাফাবেন, সে তো স্বাভাবিক। সারা জীবন পানির সঙ্গে সহবাস, আপনি তো পানির পোকা। তবু মেয়েটাকে বাঁচাতে পারলেন না!
ইদ্রিশ কাঁদো-কাঁদো হয়ে বলল, বহুৎ আফসোস কি বাৎ হুজুর। এরকম মুসিবৎ আমার জীবনে কখনও হয়নি। অতটুকু মেয়ে পানিতে পড়ে গেল, আমি একটুও দেরি করিনি। তবু তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না! খোদা কা কেয়া মর্জি!
দারোগা বললেন, খোদার নামে অহেতুক দায় চাপিও না, ইদ্রিশ। তিন্নি পড়ে গেল নৌকোর ডান ধারে, আর তুমি লাফ দিলে অন্য ধারে, তাই না? তা হলে আর তুমি মেয়েটাকে পাবে কী করে?
দারুণ বিহ্বলভাবে ইদ্রিশ বলল, আপনি এসব কী বলছেন, হুজুর। ডান ধারে, অন্য ধারে, এসব তো আমি কিছুই বুঝছি না।
দারোগা বললেন, বিপদের সময় এসব মনে রাখাও শক্ত। আচ্ছা ইদ্রিশ, বলো তো, মেয়েটার লাশ গেল কোথায়? এইসব পানিতে ডোবা কেসে লাশ ভেসে ওঠে। তিন্নির কী হল?
ইদ্রিশ নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে, পুলিশের সামনে একজন সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার সামলে নিয়ে বলল, সে আমি কেমনে জানব? নদীর গর্ভে কত কী তলিয়ে যায়। এখন আবার কুমির-কামঠের উপদ্রব শুরু হয়েছে। কোনও কামঠই ওকে টেনে নিয়ে গেছে মনে হয়।
নিয়ামত খান আর-একটা সিগারেট কিংবা চুরুট খোঁজার জন্য এ-পকেট সে-পকেট হাতড়িয়ে তারপর সামনের একটা রেকাবি থেকে এক খিলি পান মুখে দিয়ে আধ মিনিট সময় নিলেন।
তারপর বললেন, কামঠে নিয়ে গেছে। কামঠ-কুমির আছে জেনেও তুমি কেন পানিতে ঝাঁপ দিলে? তোমার প্রাণের মায়া নেই?
ইদ্রিশ বলল, হুজুর, গরিবের তো প্রাণের বিপদ প্রতি পদে-পদে। ওসব ভাবলে কী চলে?
এরকম একটা আপ্তবাক্য শুনেও হা-হা করে হেসে উঠলেন নিয়ামত খান। আপন মনে বললেন, যাত্রা আর টিভি সিরিয়ালের এমন ডায়ালগ সবাই শিখে গেছে।
তারপর তিনি হাঁক দিলেন, দরোয়াজা!
একজন সেপাই পাশের ঘরের দরজা খুলে দিল। নিয়ামত বললেন, ইদ্রিশ ওই দিকে ভালো করে দ্যাখো!
ইদ্রিশের তখন ভূত দেখার মতন অবস্থা।
সে ঘরের একটা টুলে বসে আছে তিন্নি, তার মাথায় একটা ব্যান্ডেজ। সে একটা ভুট্টার দানা খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে!
ইদ্রিশের মুখে আর কোনও কথা নেই।
নিয়ামত খান বললেন, তুই ওর মাথায় মেরেছিলি। আঘাতটা তেমন-তেমন জোর হয়নি। তোরা ভেবেছিলি, ও মরেই গেছে। তুই কিংবা তোর মুরুব্বিরা কেউ জানতই না যে তিন্নি এই বয়েসেই সাঁতার শিখে নিয়েছে। যে সাঁতার জানে, সে জ্ঞান থাকলে ডুবে মরে না! বুঝলি?
ইদ্রিশ বিস্ফারিত চক্ষে চেয়ে রইল।
নিয়ামত বললেন, ও মেয়েটার যদি মৃত্যু হত, তা হলে তোরও নির্ঘাত মৃত্যুদণ্ড হত, বুঝলি? মৃত্যু ঘটাবার চেষ্টাও বিরাট অপরাধ। বছরদশেক তোকে ঘানি ঘোরাতে হবে তো নিশ্চিত।
ইদ্রিশ বলল, ঠিকই তো!
নিয়ামত একটু কৌতূহলভরে জিগ্যেস করলেন, কী বললি? কী ঠিকই তো?
ইদ্রিশ বলল, আমি পাপী হুজুর। অর্থলোভে এ কাজ করেছি। নিজের ছেলের চিকিৎসার কথা ভেবে, না, হুজুর, কোনও কারণেই অপরের প্রাণ নেওয়া যায় না। আমার যা হয় হোক হুজুর, আমি তিন্নির মৃত্যুর জন্য দায়ী, আমাকে শাস্তি দিন।
নিয়ামত বাঁকা সুরে বললেন, এখন ধরা পড়ে তুই শালা আমাদের মন ভেজাবার চেষ্টা করছিস। শাস্তি তোকে পেতেই হবে। ওসব অভিনয় আমরা অনেক দেখেছি। ইরফানের কাছ থেকে যা টাকা পেয়েছিস, সব লুকিয়ে রেখেছিস অন্য জায়গায়। তোর ছেলে-মেয়েদের তুলনায় তিন্নির জীবনের বুঝি কোনও দাম নেই?
ঘুষখোর, বাজখাঁই ধরনের দারোগা নিয়ামত খান তিন্নিকে ডেকে আনলেন সামনে। তার দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে বললেন, ওয়ান্ডার। লাইফ ইজ ফুল অফ ওয়ান্ডার্স।
হরিদেবপুর শ্মশানে সবাই প্রথমে তিন্নিকে প্রেতযোনিই ভেবেছিল।
তখন মধ্যরাত্রি। এ সময়ে শ্মশানে কোনও শবদেহ আসেই না বলতে গেলে, কিন্তু বেশ কিছু গেঁজেল সেখানে আড্ডা মারে। দুজন সাধুর আখড়ায় ধুনি জ্বলে।
সেই সময় নদী থেকে উঠে আসা এক জীবের ক্রন্দনশব্দ শুনে শ্মশানচারীরা সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিল। হামাগুড়ি দিয়ে আসছে প্রাণীটি, মনুষ্য আকৃতি, শরীরে এক বিন্দু সুতো নেই, রক্ত-কাদা মাখা, মাঝে-মাঝে থামছে আর ফোঁপাচ্ছে।
সাঁতার জানে বলেই বেঁচে এসেছে তিন্নি, তার পরনের শাড়িটাড়ি কোথায় খুলে গেছে। চেহারাটাও তখন এমনই বীভৎস যে দেখলে ভয় লাগারই কথা। শেষপর্যন্ত সেই শ্মশানের লোকেই তাকে খাদ্য-বস্ত্র দিয়েছে। ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়েছে মাথায়। আশ্রয় পেয়েছে বান্ধব সমিতিতে।
দু-দিন আগে যে সাক্ষাৎ যমের গ্রাস থেকে ফিরে এসেছে, তিন্নির মুখ দেখে তা বোঝার উপায় নেই। দিব্যি কামড়ে-কামড়ে খাচ্ছে ভুট্টার দানা।
বেশ কয়েক পলক তিন্নির দিকে তাকিয়ে থাকার পর নিয়ামত খান হুকুম দিলেন ইদ্রিশকে গারদে আটকে রাখার।
লায়লা না হয় সৎমা, কিন্তু ইরফান তো সাক্ষাৎ পিতা। সেই পিতা হয়ে সে নিজের কন্যাকে খুন করার ব্যবস্থা করেছিল, এরকম একটা ঘৃণ্য অপরাধের মূল আসামি তো ইরফানই। অথচ, কী আশ্চর্যের ব্যাপার, ওই স্বামী-স্ত্রীকে ধরার কোনও চেষ্টাই করলেন না দারোগা সাহেব।
যদিও তিনি ঘুষ খেয়েছেন, কত খেয়েছেন, তা জানতে থানার কারওরই বাকি নেই। ও ঠিক জানাজানি হয়ে যায়। কিন্তু অত বড় ক্রাইমের জন্য ওই সামান্য টাকা? অন্য সময় তিনি অন্যদেরও কিছু ভাগ দেন, এবার কিছু দিলেন না। অবশ্য ওই টাকার ভাগ-বাটোয়ারাই বা কী হবে! দারোগা সাহেব কি আরও কিছু আদায় করার আশায় আছেন?
পুলিশের কাজে যারা ঝানু হয়ে গেছে, তারাও জানে, শত ঘুষ দিয়েও সব অপরাধ চাপা দেওয়া যায় না। পাবলিক খেপে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই মাঝে-মাঝে কিছু কাজ দেখাতেই হয়। এটাও একটা বেশ বড় ঘটনা। হাটে-বাজারে মানুষজন এ নিয়েই কথা বলছে, তাদের চুপ করানো যাবে না, দারোগা সাহেব তা বুঝছেন না কেন?
হলও তাই। পরদিনই চার-পাঁচজন লোক সঙ্গে নিয়ে থানায় এলেন নিখিল মাস্টার। দারোগা সাহেবের সঙ্গে তার আলাপ আছে, ভালোই সম্পর্ক। কিন্তু এখন উত্তেজিতভাবে, চক্ষুলাল করে, তেতেফুঁড়ে বললেন, এটা আপনি কী করছেন বলুন তো! একটা বাচ্চা মেয়ে খুন হতে যাচ্ছিল। সেই খুনিদের আপনি ধরবেন না? তাদের শাস্তি হবে না?
বেশিক্ষণ পা ঝুলিয়ে বসলে নিয়ামত খানের পা ফুলে যায়। তাই টেবিলের ওপর পা তুলে বসা তাঁর অভ্যেস।
নিখিল মাস্টারকে দেখে তিনি পা নামালেন। শান্তভাবে বললেন, খুনি বলছেন কাদের? খুনটা হল কোথায়? মেয়েটা তো দিব্যি বেঁচে আছে।
আরও রেগে গিয়ে নিখিল মাস্টার বললেন, মেয়েটা বেঁচে আছে ওর আয়ুর জোরে। ওকে মেরে ফেলতেই চেয়েছিল। মাথায় আঘাত করেছে, ভরা নদীতে ফেলে দিয়েছে, ইনটেনশান টু মার্ডার। এটা ক্রাইম নয়? এর জন্য লাইফ টার্ম হতে পারে!
নিয়ামত খান বললেন, দাঁড়ান, দাঁড়ান, অত চিৎকার করছেন কেন? আপনারা সবাই বসুন। নৌকোয় ছিল তিন জন অ্যাডাল্ট, আর ওই খুকি। বড়রা তিন জনই বলছে, এটা দুর্ঘটনা। শুধু ওই বাচ্চা মেয়ের কথায় ক্রাইম প্রমাণ করা যাবে? বাবা আবার বিয়ে করলে অনেক ছেলেমেয়েই তা মেনে নিতে পারে না। তারা বানিয়ে-বানিয়ে মিথ্যে কথা বলে।
টেবিলের ওপর প্রচণ্ড চাপড় মেরে নিখিল মাস্টার বললেন, আপনি বায়াসড। আপনি ঘুষ খেয়েছেন।
দু-দিকে মাথা নাড়তে-নাড়তে জিভ দিয়ে চুকচুক শব্দ করে দারোগা বললেন, উঁহু। না, না, হাতে-হাতে ধরা না পড়লে ঘুষ খাওয়ার অভিযোগ করাটা কি ঠিক? এটা কি ভদ্রতাসম্মত স্যার?
নিখিল মাস্টার বললেন, রাখুন আপনার ভদ্রতা! একটা নিষ্পাপ মেয়ে, অতটুকু বয়েস, তাকে ওরকম নৃশংসভাবে হত্যার চেষ্টা, তাও নিজের বাবা, এরকম খুনি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে? আপনারা কিছু করবেন না?
দারোগা বললেন, কী করব বলুন মাস্টার সাহেব, আইন তো অন্ধ, প্রমাণ ছাড়া কিছুই বোঝে না! দেখুন যদি আপনারা কিছু করতে পারেন।
নিখিলের পাশ থেকে আর একজন বললেন, আমরা তো ব্যবস্থা নেবই। জনগণ ওকে ছাড়বে না!
গভীর সন্তুষ্টির সঙ্গে দারোগা সাহেব বললেন, আজকাল তো জনগণই ভরসা।
তারপর তিনি অকারণে হাসলেন।
সেইদিনই দুপুরের দিকে ধেয়ে গেল কয়েকশো মানুষ ইরফানের বাড়ির দিকে। ইরফান আর লায়লা দুজনকেই টেনে ছিঁচড়ে নিয়ে গেল নদীর ধারে অর্ধেক ইস্কুল বাড়ির পাশে। সেখানে শুরু হল সালিশি সভা।
দারোগা সাহেব আজ একবারও বেরোননি। হঠাৎ আজ অস্বাভাবিক গুমোট, সবাই ঘামছে দরদর করে। দারোগা সাহেব পুরো দস্তুর পোশাক পরে আছেন বটে, কিন্তু বুকের বোতামগুলো সব খোলা।
বিকেলবেলায় তাঁর জলখাবার মুড়ি আর তেলেভাজা। টেবিলের ওপর খবরের কাগজ পেতে ঢালা হয়েছে আড়াইশো মুড়ি। মাখা হয়েছে সর্ষের তেল দিয়ে, আনানো হয়েছে গরম-গরম ফুলুরি আর আলুর চপ। আর কাঁচালঙ্কা-পেঁয়াজ। দারোগা সাহেব টিয়াপাখির মতন কচকচ করে লঙ্কা খেতে পারেন।
তিনি এস.আই. নিত্যলাল সাহাকেও ডেকে নিলেন।
নিত্যলাল খুবই ঢ্যাঙা, ছ'ফুটের বেশি, গায়ের জামা ঢলঢল করে। তার চোখ দুটো লাল থাকে সব সময়, কিন্তু সে গাঁজা খায় না, কোনও রোগ আছে চোখের।
এক গাল মুড়ি চিবোবার পর নিত্যলাল বলল, আজ যেখানে ইস্কুল বিল্ডিং ফান্ডের মিটিং ছিল দুপুরে, সেখানেই এখন চলছে সালিসি সভা।
দারোগা সাহেব বললেন, হুঁ।
নিত্যলাল বলল, দুটো গাধা জোগাড় করেছে। একটা নাপিতকেও বসিয়ে রেখেছে সেখানে। ওদের ভয় দেখানো হচ্ছে, শাস্তি হিসেবে দুজনের মাথা ন্যাড়া করে ঘোল ঢেলে উলটো গাধায় চাপিয়ে দু-তিনখানা গাঁ ঘোরাবে। ওরা কিছুতেই দোষ স্বীকার করছে না।
লঙ্কায় কামড় দিয়ে দারোগা সাহেব বললেন, তাই বুঝি?
নিত্যলাল বলল, স্যার একটা কথা জিগ্যেস করব? এখন নদীর যা তেজ, সাঁতার না জানলে বাচ্চা মেয়েটা নির্ঘাত ডুবে মরত। খুনের অভিযোগ স্পষ্ট। তবু আমরা ওই স্বামী-স্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনও অ্যাকশান নিলাম না, ঠিক মতন এনকোয়ারিও করা হল না, তা নিয়ে পাবলিক নানা কথা বলাবলি করছে। অনেক লোক খুব ক্ষেপে আছে। সালিসিতে হঠাৎ যদি মারধর শুরু করে, গণধোলাইতে ইরফান আর তার বউকে যদি একবারে মেরেই ফেলে, তা হলে আমাদের থানার নামে—
একটা হাত তুলে প্রশান্তভাবে দারোগা বললেন, মারবে না, মারবে না। ওরা বড়লোক। বড়লোক কখনও গণধোলাইতে মারা যায় শুনেছ? কক্ষনও না। গরিব মানুষদেরই পিটিয়ে মারা সহজ!
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে নিত্যলাল আবার বলল, আপনি আসল কালপ্রিটকে কিছু বললেন না, আর ইদ্রিশ মিঞাকে আটকে রাখলেন, মানে, এতে লোকের মনে, কয়েকজন আমাকে শুনিয়ে- শুনিয়ে বলেছে, ইদ্রিশ একটা গরিব মানুষ, ওর টাকাপয়সা খরচা করার সামর্থ্য নেই, তাই পুলিশ ওকে শাস্তি দিচ্ছে। আর ওর মালিকরা—
এবারে হাত তুলে নিত্যলালকে থামিয়ে দিয়ে দারোগা সাহেব বললেন, এসব কথা লোকে বলছে, না তুমি নিজেই আমাকে বলছ? তোমার বিবেক চেগে উঠেছে? তা হলে তোমার বিবেকবাবুকে বলো একটু বুদ্ধি খাটাতে। ইদ্রিশ গরিব বলেই তাকে আটকে রেখেছি, তা ঠিক। কিন্তু কেন? ইদ্রিশই মেয়েটার মাথায় ডাণ্ডা মেরেছে, এ কথাটা জানাজানি হলে লোকের রাগ প্রথমেই এর ওপর গিয়ে পড়ত। একদল লোক ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে চিঁড়ে-চ্যাপটা করে দিত যদি? আমরা ওকে বাঁচাতে পারতাম? ওকে বাঁচাবার জন্যই গারদে ভরে রেখেছি। আরও বলছি শোনো—দেশলাই আছে? দাও! ফস করে একটা সিগারেট ধরিয়ে দারোগা বললেন, ওই ইরফান হারামজাদা আর ওর ওই ছেনালি বউটার নামে অনেকগুলো কেস সাজিয়ে কাঠগড়ায় তোলা যেত ঠিকই। কিন্তু খুন তো হয়নি, তাই ওদের ফাঁসি হত না, বড় জোর আট-দশ বছরের মেয়াদ। তাতে ওদের কী আর এমন শাস্তি হত? আট বছর পর ড্যাংডেঙিয়ে জেল থেকে বেরিয়ে আবার সুখের পায়রা ওড়াত। আসল শাস্তি হত কার? ওই মেয়েটার? এই আট-দশ বছর সে কোথায় থাকত, কে তাকে খেতে দিত? এ যুগে কেউ বেশি দিন স্নেহ, দয়া, মায়া দেখায় না! পয়সা চাই, পয়সাটাই আসল, বুঝলে? এখন জনসাধারণের যুগ, জনসাধারণকেই কেসটা হ্যান্ডল করতে দাও। বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে রেখে আরও দুটো আলুর চপ খাও আর চায়ের ব্যবস্থা দ্যাখো।
নিত্যলাল চুপ করে গেল বটে, কিন্তু মুখ দেখে মনে হয়, এখনও তার মনটা যেন খুঁতখুঁত করছে। থানার উপরি রোজগার যখন ভাগ-বাটোয়ারা হয়, তখন সেও কিছু পায়, তখনও তার মন খুঁতখুঁত করে!
যেখানে সালিসি সভা বসেছে, সেখান থেকে থানার দূরত্ব বড় জোর মাইল দু-এক। ঘনঘন সেখানকার খবর এসে পৌঁছোচ্ছে থানায়। দারোগা সাহেবের কড়া নির্দেশ, কোনও পুলিশ সে সভার ধারে-কাছে যাবে না। এখন পুলিশের ওপর মানুষের খুব রাগ।
সন্ধের দিকে খবর এল, সালিসি সভায় খুব শোরগোল চলছে, কী যেন একটা মিটমাট হয়েছে, দোষ স্বীকার করেছে স্বামী-স্ত্রী। রসগোল্লা আসছে বিষ্টু ময়রার দোকান থেকে।
একথা শোনা মাত্র উঠে দাঁড়িয়ে দারোগা সাহেব বললেন, রসগোল্লা? তার মানে তো নিশ্চিত খোসখবর। রসগোল্লা খেলে সকলেরই মেজাজ ভালো হয়ে যায়, তখন আর পুলিশের ওপরেও রাগ থাকে না।
কোমরের বেল্ট আঁটতে-আঁটতে তিনি হেঁকে বসলেন, চল হে নেত্যলাল, আমরাও রসগোল্লা খেয়ে আসি। তবে গানটাও সঙ্গে নিও, বলা তো যায় না।
নিজের রিভলভারটাও তিনি গুঁজে নিলেন।
এ থানার একটা গাড়ি ছিল বটে, অনেকদিন আগেই সেটা বরবাদ হয়ে গেছে। নতুন গাড়ির স্যাংশান হয়নি।
তবে, দারোগা সাহেবের নিজস্ব মোটরবাইক আছে। নিত্যলালকে চাপিয়ে নিলেন পিছনে।
জিপগাড়ির চেয়েও মোটরবাইকের আওয়াজের দাপট বেশি। পুরো জনতার দৃষ্টি কেন্দ্রীভূত হল পুলিশদ্বয়ের দিকে।
স্কুলবাড়ির আধখানা চলে গেছে নদীগর্ভে, বাকি অর্ধেক ঝুলছে বলা যায়। একটা বড় আমগাছ কাত হয়ে পড়েছে, তার শেকড় থেকে খসে গেছে অনেকটা মাটি। হঠাৎ দেখলে মনে হয়, গাছটা যেন বাঁচবার জন্য আর্তভাবে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাকে বাঁচাবার কোনও উপায় নেই।
লালু শালুতে স্কুল বিল্ডিং ফান্ড কমিটির আবেদন লেখা নিশানা বাঁধা আছে দুটো বাঁশের খুঁটিতে। সামনে দুটো চৌকি পাতা, সেটাই মঞ্চ। স্কুলের মিটিং হয়ে গেছে দুপুরে, সেটা বিশেষ জমেনি, সালিসি সভার জন্য শেষ করে দিতে হয়েছে তাড়াতাড়ি। একটা ক্যানেস্তারায় কিছু পঞ্চাশ-একশো টাকার নোট পড়ে আছে। এইসব সভায় বক্তারা গলা ফাটিয়ে নিজেদের সরকারকে বাঁচিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মুণ্ডপাত করে, নিজেদের পকেট উপুড় করতে চায় না।
সেই মঞ্চের ঠিক সামনে ধরা পড়া চোরের মতন মুখ নীচু করে বসে আছে ইরফান আর লায়লা। শোনা যাচ্ছে একটু-একটু ফোঁপানির শব্দ। দু-হাঁড়ি রসগোল্লা পৌঁছেছে সবে মাত্র।
কিছুক্ষণ আগেও মঞ্চের ওপর বসিয়ে রাখা হয়েছিল, এখন আর তাকে দেখা যাচ্ছে না, সে মিশে গেছে ভিড়ের মধ্যে।
দারোগা সাহেবকে দেখে এগিয়ে এলেন নিখিল মাস্টার। হাসি মুখে জিগ্যেস করলেন, খবর পেয়েছেন তো সব?
নিয়ামত খান বললেন, জনগণের বিচারে কী ফয়সলা হল?
নিখিল মাস্টার বললেন, মেয়েটা যখন প্রাণে বেঁচেই গেছে আর ওকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখাই আমাদের প্রধান কাজ, তাই দোষ স্বীকার করলেও ওর বাবা-মাকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হল না। ক্ষতিপূরণ আর জরিমানা দিতে রাজি করিয়েছি।
ভুরু নাচিয়ে নিয়ামত খান জিগ্যেস করলেন, কত?
নিখিল মাস্টার বললেন, ব্যাঙ্ক থেকে আগেই হিসেব আনিয়েছিলাম। এর মধ্যে অনেক টাকাই উড়িয়েছে। যা বাকি ছিল, স্কুল বিল্ডিং ফান্ডে দিয়েছে পঞ্চাশ হাজার। আর মেয়েটার নামে আড়াই লাখ। মোটামুটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছি। এখন থেকে ইরফান আলিকে আবার খেটে খেতে হবে। আর ফুটানি চলবে না।
ঊর্ধ্বনেত্র হয়ে দারোগা সাহেব হিসেব করলেন, আড়াই লাখ? ফিক্সড ডিপোজিট যদি ন'পার্সেন্ট হয়, তা হলে হলগে নয় দুগুনে আঠারো, আর সাড়ে চার, মানে সাড়ে বাইশ হাজার বছরে, প্রতি মাসে প্রায় দু-হাজারের মতন। যথেষ্ট। মেয়েটা থাকবে কোথায়?
নিখিল মাস্টার বললেন, ওই যে দেখছেন, একলাসউদ্দীন, টাক মাথা মানুষটি, স্কুলে আমার সহকর্মী, ওর স্ত্রী অতি ভালো মানুষ, দুটি ছেলেমেয়ে আছে, এ মেয়ে থাকবে ওদের বাড়িতে, সেখানে লেখাপড়া শিখে মানুষ হবে।
দারোগা সাহেব বললেন, বাঃ!
তারপরে নিখিল মাস্টার ও তিনি পরস্পরের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ভুরু নাচালেন। যেন দুজনেই কোনও ষড়যন্ত্রের অংশীদার।
পরমুহূর্তেই তিনি মেজাজ পালটে গলা চড়িয়ে বললেন, টাকা দিয়েছে বলেই মাথা কিনে নিয়েছে নাকি? এত বড় অপরাধের শাস্তি হবে না? নাপিত চলে যায়নি তো? ও দুটোর মাথা কামিয়ে গাধায় চাপিয়ে ঘোরানো হোক।
কয়েক পা এগিয়ে তিনি পকেট থেকে দশ হাজার টাকার বাণ্ডিল সমেত খামটা অবহেলার সঙ্গে ফেলে দিলেন স্কুল বিল্ডিং ফান্ডের ক্যানেস্তারায়।