সাক্ষাত্কার

আগামী প্রজন্ম আমার কোনও কোনও লেখা পড়বে, এমন একটি বিশ্বাস আমার আছে।

সায়ম বন্দ্যোপাধ্যায়
  • এক ঈর্ষণীয় পরিমিতিবোধে উজ্জ্বল তাঁর রচনারীতি। সমসময়, ভাষা নিয়ে তাঁর গভীর ভাবনা। দিব্যেন্দু পালিত বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র নাম।
    তাঁর সাক্ষাত্‌কার নিয়েছেন সায়ম বন্দ্যোপাধ্যায়।
    সায়ম বন্দ্যোপাধ্যায়: সাহিত্যের মার্গে আপনার প্রবেশকে এখন কীভাবে দেখেন? স্বেচ্ছায় নাকি ভবিতব্য? কারণ, আপনার জন্মস্থান তো ভাগলপুর শরত্‌চন্দ্র, বনফুল, বিভূতিভূষণ, এঁদের স্মৃতিবিজরিত একটি জায়গা...
    দিব্যেন্দু পালিত: হ্যাঁ, আমার জন্ম ভাগলপুরে। আর বাংলা সাহিত্যে এই স্থাননামটি সমার্থক হয়ে গিয়েছে শরত্‌চন্দ্র, বনফুল, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, এই নামগুলির সঙ্গে। শরত্‌চন্দ্রের জন্ম হয়েছিল দেবানন্দপুরে, তাঁর মাতুলালয় ভাগলপুর। বনফুলের জন্ম মনিহারিতে। কর্মসূত্রে পরে তিনি ভাগলপুরে স্থানান্তরিত হন। বিভূতিভূষণ ভাগলপুরে খেলাত ঘোষের জমিদার বাড়ি ‘বড়বাসা’-য় নায়েবের কাজ করেছেন। সেখানে বসবাসের সময়ই তিনি ‘পথের পাঁচালী’ রচনায় হাত দেন। আমি যে-স্কুলে পড়তাম শৈশবে, সেই দুর্গাচরণ স্কুলেই পড়েছিলেন শরত্‌চন্দ্র। স্কুলে পড়াকালীনই ভাগলপুরের বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ আয়োজিত একটি সর্বভারতীয় গল্প প্রতিযোগিতায় আমি প্রথম হয়েছিলাম। প্রতিযোগিতাটির অন্যতম বিচারক ছিলেন বনফুল। তিনি জানতেন না সেই গল্পটির লেখক আমি। পুরস্কার প্রদানের দিনই জানতে পারলেন। অবাক হয়ে আমায় জিজ্ঞেস করলেন, গল্পটি কবে লিখলে? আমি জানালাম, এই পুরস্কারের জন্যই লিখেছি। তিনি বললেন, তোমার লেখার হাত ভাল। চেষ্টা করো, একদিন সফল হবে। সাহিত্যের মার্গে সেই আমার প্রথম প্রবেশ। প্রবেশটি তাই স্বেচ্ছায় হলেও, ঘটনাটিকে অবশ্যই ভবিতব্য বলা যেতে পারে।  
    প্র: পিতার মৃত্যুর পর কলকাতায় এসেছিলেন চাকরির খোঁজে। তারপর আবার পড়াশোনায় - যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে - চলে গেলেন কেন?
    উ: পড়াশোনায় ঢুকে গেলাম কারণ, একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম বলে। তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়টির প্রতি আমার গোড়া থেকেই আকর্ষণ ছিল। এই আকর্ষণের মূল ছিলেন অবশ্যই বুদ্ধদেব বসু। আমায় সেই বিভাগে ভর্তি হয়ে পড়াশোনার সুযোগটা তিনিই করে দিলেন। আমি এরকম একটি সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি।
    প্র: বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে তখন পরিচয় হয়ে গিয়েছে?
    উ: হ্যাঁ। কলকাতায় আসার আগেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি ওঁর ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখা পাঠিয়েছিলাম। তিনি তা প্রকাশও করেছিলেন।
    প্র: বুদ্ধদেব বসুর প্রভাব কতটা আপনার সাহিত্যবোধের উপর? সাহিত্যজীবনের উপর?
    উ: শৈশবের পড়াশোনার ধরনটা খুব গোছালো ছিল না। রবীন্দ্রনাথ, শরত্‌চন্দ্র কিছু-কিছু পড়ে ওঠার আগেই বুদ্ধদেব বসু, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এমনকী ডিকেন্স, ডি এইচ লরেন্সও পড়ে ফেলি। তবে আমার সাহিত্যবোধের উপর বুদ্ধদেব বসুর প্রভাবটা ছিল শুরু থেকেই। মনে পড়ে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বুদ্ধদেব বসু একবার কোনও এক প্রসঙ্গে আমায় বলেছিলেন যে, কল্পনাশক্তি, কাহিনিবয়নের ক্ষমতা, চরিত্র-নির্মাণ ও সংলাপ-রচনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলে যে-কেউ একটু চেষ্টা করলেই লেখক হতে পারেন। তবে ‘সাহিত্যিক’ হতে গেলে দ্রষ্টা হতে হয়। কথাগুলি সেই থেকে আমার মননে গ্রথিত।
    প্র: আপনার প্রথম বই, প্রথম উপন্যাসও, ‘সিন্ধু বারোয়াঁ’। প্রকাশকাল ১৯৫৯। আপনার বয়স তখন কুড়ি। তারপর লিখেছেন আরও। আপনার উপন্যাসের সংখ্যা তিরিশের বেশি। লিখনশৈলীতে, ভাষায় কতটা পরিবর্তন সচেতনভাবে হয়েছে আর কতটাই বা অজ্ঞাতে - আপনার কী মনে হয়?
    উ: ‘সিন্ধু বারোয়াঁ’ আমার প্রথম বই তথা প্রথম উপন্যাস। সেটি ১৯৫৯ প্রকাশিত হলেও রচিত হয়েছিল তারও বছর তিনেক আগে। মধ্যবর্তী অনেকটা সময়ই যায় পরিমার্জনা ও সংশোধনে। পরবর্তী রচনাগুলিতে লিখনশৈলী ও ভাষায় বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে সচেতনভাবেই। সত্যি বলতে, লেখার শুরু থেকেই আমি পরিমার্জনায় বিশ্বাসী।
    প্র: আপনার উপন্যাসের বহর বেশি হয় না। এ কি কোনও সচেতন প্রয়াস? আপনার ইউরোপীয় সাহিত্য অনুরাগের প্রভাব? আপনার সমসাময়িকরা তো একাধিক দীর্ঘ উপন্যাস লিখেছেন। সেরকম কোনও উপন্যাস লিখতে ইচ্ছে হয়েছে কখনও? বা চেষ্টা করেছেন? 
    উ: এটা সত্য যে, আমার উপন্যাসের আয়তন সাধারণত বেশি হয় না। অকারণে কলেবর বৃদ্ধির প্রতি আমার আকর্ষণ বরাবরই কম। বরং লেখায় আমি পরিমিতিবোধকেই প্রশ্রয় দিই বেশি। বিদেশি বা ইউরোপীয় সাহিত্য পাঠের অভ্যেস থেকেই আমার এই অভ্যেস গড়ে উঠেছে, এটা স্পষ্ট। আমার সমসাময়িকরা দীর্ঘ উপন্যাস লিখেছেন বলেই আমাকেও সেরকম লিখতে হবে কেন? বিষয়ের প্রয়োজনই লেখার দৈর্ঘ্য নির্দিষ্ট করে। আমার সমসাময়িকরা দীর্ঘ উপন্যাস সংখ্যায় বেশি লিখেছেন ধারাবাহিক উপন্যাস বেশি লেখার কারণে- সেসব রচনার অনেক অংশই অনেক সময় আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। অতিকথন যে-কোনও রচনারই বড় ত্রুটি গণ্য হতে পারে। লেখায় সংযম যে-কোনও সময়ে একটি বড় গুণ। লেখায় শিল্পগুণ বা ভাষাগুণ বলতেও এটাই বোঝায়, অন্তত আমি এভাবেই বুঝেছি। ‘লেখক’ ও ‘সাহিত্যিক’-এর মধ্যে পার্থক্যও এইখানে। আমি নিজেকে ‘সাহিত্যিক’ আখ্যা দিতেই পছন্দ করব। বিভিন্ন গ্রন্থে ভাষার যেটুকু পরিবর্তন তা সচেতনভাবেই হয়েছে বলে মনে করি। 
    প্র: আপনি কোনও ধারাবাহিক উপন্যাস লিখলেন না কেন?
    উ: এর অনেস্ট আনসার হল, আমার কাছে ধারাবাহিক লেখার কোনও প্রস্তাব বা সুযোগ আসেনি। হয়তো বাণিজ্যিক কারণেই আসেনি। আবার সেই সঙ্গেই বলি, এলেও লিখতাম কিনা, তা নিয়ে নিজেরও সন্দেহ আছে!
    প্র: আলব্যের কাম্যুর রচনা আপনার বিশেষ পছন্দের...
    উ: হ্যাঁ... কাম্যু আমার বিশেষ প্রিয়। ফরাসি এই সাহিত্যিকের কিংবদন্তি প্রবন্ধগ্রন্থ ‘দ্য মিথ অফ সিসিফাস’ থেকে তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসগুলি ‘দি আউটসাইডার’, ‘দ্য প্লেগ’, ‘দ্য ফল’ প্রভৃতি আমি খুব মন দিয়ে পড়েছি।  তেমনই পড়েছি কাম্যুর ‘ক্যালিগুলা’, ‘ক্রস পারপাস’ নাটক এবং দার্শনিক প্রবন্ধ ‘রেজিস্ট্যান্স, রেবেলিয়ন অ্যান্ড ডেথ’ ইত্যাদি। কাম্যু অত্যন্ত বড় মাপের একজন সাহিত্যিক। মন্ত্রের মতো আকর্ষণ করেন আমায়। 
    প্র: আর বাংলায়?
    উ: বাংলায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়... তাঁর তুল্য কথাশিল্পী পাওয়া কঠিন। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ পাঠ একজন লেখকের পক্ষে সারাজীবনের অভিজ্ঞতা হতে পারে। এরকম উপন্যাস আমি কমই পড়েছি।
    প্র: আপনার সমসাময়িক বাংলা লেখকদের মধ্যে?
    উ: গদ্যে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, মতি নন্দী। কবি হিসেবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত।
    প্র: আপনি যে-সময়টার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, আপনার উপন্যাসগুলি সেই সময়ের এক-একটি মনস্তাত্ত্বিক দলিল। বলা যায়, একধরনের সাইকোলজিক্যাল হিস্ট্রি বা ন্যারেটিভ। উপন্যাস লেখার সময় নিজেকে ভাষাশিল্পী হিসেবে দেখেন, না সময়ের ধারাভাষ্যকার হিসেবে?
    উ: ভাষাশিল্পী হিসেবেই দেখি নিজেকে। সময়ের ধারাভাষ্যকার হিসেবে ততটা নয়। আমি উপন্যাস লিখেছি মূলত আমার সাহিত্যভাবনা, ভাষাভাবনা থেকেই। 
    প্র: আচ্ছা, আপনার ‘সহযোদ্ধা’ উপন্যাসের সূত্র কি উত্তমকুমারের সরোজ দত্তের নিধন দেখে ফেলার ঘটনা?
    উ: ‘সহযোদ্ধা’ উপন্যাসের উত্‌সে উত্তমকুমারের ওই ঘটনাটির যোগ আছে কি না এ প্রশ্ন কেউ-কেউ আমায় করেছেন। এর উত্তর আসলে আমিও ঠিক জানি না- ঘটনাটির কোনও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য আমার কাছে নেই। ওই ঘটনা রটনা বলেই মনে হয়। সেই সময়ের সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ কারও রচনাতেই এমন কোনও ঘটনার উল্লেখ পাইনি। সময়টাই ছিল ওইরকম। ঐতিহাসিক পটভূমি হিসেবে সে-সময়কে আমিও ব্যবহার করেছি। আবার এ-ও মনে রাখতে হবে, সরোজ দত্ত-র ঘটনা, তাঁর মৃত্যু, নকশাল আন্দোলন কোনওটাই তো গুজব নয়, কাল্পনিক ব্যাপারও নয়। সে সময়ের পুলিশি অত্যাচারের ঘটনার সঙ্গেও সত্যের যোগ আছে। উপন্যাসটি রচনার সময়ে আমি যথাসম্ভব এই সব সত্যের আশ্রয় নিয়েছি।
    প্র: এই প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করছি, আপনার সময়ের সেই অতি-বাম রাজনীতি, যা এখন এক ‘মিথ’, দেশি-বিদেশি গবেষকদের ও লেখকদের কাছে রীতিমতো ‘Exotic’ এক বিষয়, তা আপনাকে কখনও প্রভাবিত করেছিল? বা বিচলিত করেছিল? ‘সহযোদ্ধা’ তো একজন লেখকেরই একটু অন্যভাবে নকশালপন্থীদের সহযোদ্ধা হয়ে ওঠার আখ্যান।
    উ: অতি বাম রাজনীতি আমায় প্রভাবিত করেনি। আমার কোনও পলিটিক্যাল সিমপ্যাথি  ছিল না কারও প্রতি। তবে হ্যাঁ, বিচলিত করেছিল। বিচলিত না করলে ওইভাবে লেখাটি আসত না। আমি যে সময়টাকে ব্যবহার করেছিলাম ঘটনাচক্রে সেই সময়টাই ছিল উত্তাল। অ্যান্ড আফটার অল, সরোজ দত্ত-র মৃত্যুটা আর যাই হোক, আকস্মিক নয়। তাঁকে হত্যাই করা হয়েছিল। ইতিহাসে অন্তত এর উল্লেখ আছে। এবং আমি সাহিত্যের দিক থেকেই পুরো বিষয়টিকে দেখার চেষ্টা করেছি।
    প্র:  আপনি কবিতাও লিখেছেন। কবিতা লেখার শুরু কীভাবে?
    উ: ওই যাদবপুরে তুলনামুলক সাহিত্যপাঠের সময়ই কবিতা লেখার শুরু। বুদ্ধদেব বসুর সান্নিধ্যে ও উত্‌সাহেই কবিতারচনার সূত্রপাত। কম কবিতা লিখিনি। আমার কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা তো এক ডজনেরও বেশি।
    প্র: গল্পকার-ঔপন্যাসিক হিসেবে কবিতায় আপনার/একজনের কী বলার থাকতে পারে? যিনি লিখছেন, তাঁর একাধিক মাধ্যমে লেখার প্রয়োজনীয়তা কি আছে?
    উ: অনেকেই প্রয়োজনীয়তার প্রশ্নটা তোলে। তবে এটা ঠিক নয়। আসলে এই একাধিক মাধ্যমে প্রবেশটা হয়েই যায়, স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। লেখকের কিছু ‘বলা’-টাই মাধ্যম বেছে নেয়। যেমন, সত্যি বলতে, কবিতা লেখার প্রতি আমার ঝোঁক বরাবরই ছিল। গল্প এবং কবিতা আমি একই সঙ্গে লিখতে শুরু করি। এরপর ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’ ও অন্যান্য সমসাময়িক পত্রপত্রিকায় আমার কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে।
    প্র: আপনার গল্প নিয়ে, উপন্যাস নিয়ে একাধিক সিরিয়াল ও চলচ্চিত্র হয়েছে - ‘ঘরবাড়ি’ উপন্যাস নিয়ে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘গৃহযুদ্ধ’, ‘অন্তর্ধান’ উপন্যাস নিয়ে একই নামে তপন সিংহের ছবি যাদের মধ্যে স্মরণীয়। নির্মাল্য আচার্যের সঙ্গে আপনি চলচ্চিত্র সংক্রান্ত একটি গ্রন্থও (‘শতবর্ষে চলচ্চিত্র’) সম্পাদনা করেছেন। চলচ্চিত্র নিয়ে আপনি কখনও ভেবেছেন আলাদা করে? লেখার চেয়ে ফিল্ম অনেক শক্তিশালী মাধ্যম, এমনটা মনে হয়েছে কখনও? চিত্রনাট্য লিখতে ইচ্ছে হয়েছে? আপনার লেখায় কখনও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে কোনও ফিল্ম?
    উ: চলচ্চিত্র যে একটি শক্তিশালী মাধ্যম, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আমি বরাবরই এটা বিশ্বাস করে এসেছি। একটা কথা এখানে বলে রাখা ভাল যে, নির্মাল্য আচার্যের সঙ্গে যে-বইটা আমি সম্পাদনা করেছি, সেখানে নির্মাল্যর ভূমিকা খুবই কম ছিল। তার কারণ, সম্পাদনার কাজে হাত দেওয়ার আগেই ও ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। কিছুদিনের মধ্যেই ওর মৃত্যু হয়। তখন সম্পাদনার দায়িত্বটা পুরোটাই আমায় নিতে হয়, প্রকাশকের ইচ্ছায়। আমি সেইভাবেই বইটার পরিকল্পনা করেছিলাম। এবং শেষপর্যন্ত বইটা বের হতে পারে। সিনেমার সঙ্গে একটা যোগ আমার হয়েই গিয়েছিল। আমি যখন আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করতাম, তখন আমি সিনেমা সংক্রান্ত বিষয়েরই সম্পাদক ছিলাম। কিন্তু না, মৌলিক চিত্রনাট্য লিখতে ইচ্ছে হয়নি কখনও। লেখার চেষ্টাও করিনি। মাঝে-মাঝে যাঁরা আমার লেখা নিয়ে সিনেমা ইত্যাদি করেছেন, তাঁদের কাছ থেকে চিত্রনাট্য রচনার প্রস্তাব এলেও আমি তাতে খুব একটা উত্‌সাহ বোধ করিনি। আমি মনে করি চিত্রনাট্য রচনা একটা স্বতন্ত্র কাজ। আর কোনও ফিল্ম সেভাবে আমায় লেখালিখিতে অনুপ্রেরণা যোগায়নি।
    প্র: কাদের ছবি আপনার ভাল লাগত?
    উ: আন্তর্জাতিক স্তরে ইংমার বেয়ার্ম্যান (Ingmar Bergman)-এর ছবি আমার প্রিয় ছিল। খুব আকর্ষণ করত মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিয়োনি-র ছবিও। আর এখানে সত্যজিত্‌, মৃণাল সেন তো ছিলেনই।   
    প্র: কখনও কি মনে হয়েছে যে, বাংলা উপন্যাস সেল্‌ফ প্যারোডি করে গিয়েছে ভীষণ? অর্থাত্‌, অবৈধ-পরকীয়া প্রেম-মধ্যবিত্তের দাম্পত্য, এই বহুচর্চিত দিকগুলিকেই বারবার হাজির করে রচিত হয়ে গিয়েছে/ যাচ্ছেও অজস্র উপন্যাস? আপনি বিদেশি সাহিত্য অধ্যয়ন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। কখনও মনে হয়েছে, সেখানে আখ্যান-ভাষা-কাঠামো-বিষয় নিয়ে যেমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে বা চলছে, তেমনটা বাংলা সাহিত্যে হল না?
    উ: বিদেশি সাহিত্যে আখ্যান-ভাষা-কাঠামো নিয়ে যতটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে, সত্যিই, বাংলায় তা হয়নি। এ ব্যাপারে ল্যাটিন আমেরিকান সাহিত্য আমাদের কাছে দৃষ্টান্ত মনে হতে পারে। আবার অতদূর না গিয়েও বলা যায়, সলমন রুশদি যে-ধরনের লেখালিখি করেছেন, সেরকম কোনও লেখাও বাংলায় হয়নি। তাঁর লেখার মধ্যে যে-সমস্ত বিচিত্র উপাদান, যে-নবত্ব, তা তথাকথিত বাঙালি সাহিত্যিকদের মধ্যে পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেলে ভাল হত। অভিজ্ঞতার এক অন্য স্তরের দেখা মিলত। ব্যক্তিগত স্তরে বলি, আমার ‘অনুভব’ উপন্যাস তার সমকালীন অন্য উপন্যাসগুলির চেয়ে খানিকটা ব্যতিক্রমী বলে মনে হয়। উপন্যাসটি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিল তার ব্যতিক্রমী চরিত্র-চিত্রণের জন্যই। তবে, একথা ঠিক যে, বাংলা উপন্যাস আগে যে জোরালো রূপ নিয়ে দেখা দিত, এখন আর ততটা নেই। তবে, উপন্যাস একটা নতুন রূপ পেয়েছে। যে-সমস্ত উপন্যাস সাম্প্রতিককালে লেখা হয়েছে, তার মধ্যে কয়েকটাকে হেলাফেলা করা যায় না। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ মিথ-এর যেরকম প্রয়োগ ঘটিয়ে উপন্যাস রচনা করেছেন, সেই মিথের ব্যবহারে এখন অনেক লেখাই উজ্জ্বল। 
    প্র: যেমন
    উ: যেমন, অমর মিত্র-র লেখা।
    প্র: আপনার লেখা ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। তা-ও, কখনও নিজেকে ‘আঞ্চলিক’ মনে হয়েছে? আন্তর্জাতিক হওয়ার চেষ্টা বা ইচ্ছে ছিল আপনার?
    উ: না, আঞ্চলিক বলে হয়নি নিজেকে। আর ‘আন্তর্জাতিকতা’ তো আমার লেখার মধ্যেই নিহিত। ওই যে ‘অনুভব’ উপন্যাসের কথা বললাম, সে উপন্যাসটার বিভাব তো সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক। তবে, আমার বই অনুবাদ কম হয়েছে। কিন্তু বাকিদের তুলনায় অনুবাদ কম হয়েছে বলে মনে করি না।
    প্র: সাহিত্যজীবনে ‘বন্ধু’ পেয়েছেন? পেলে, তাঁরা কারা?
    উ: অবশ্যই পেয়েছি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দী। তাঁরা প্রয়াত। আমার ভাল বন্ধুর মধ্যে এখন আছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। আর সদ্য-প্রয়াত প্রকাশক বাদল বসু তো ছিলেন আশৈশব ভাল বন্ধু!
    প্র: যা-যা লিখতে চেয়েছিলেন, যেভাবে লিখতে চেয়েছিলেন, তার সবটা কি করা সম্ভব হয়েছে? বলার কি কিছু থেকে গিয়েছে বলে মনে হয়?
    উ: যা লিখতে চেয়েছি, যেভাবে চেয়েছি, তার অনেকটাই পেরেছি। তবে, সবটা সম্ভবও নয়।
    প্র: লেখা কি চলছে এখনও? না থেমে গিয়েছে?
    উ: এখনও যথাসাধ্য লেখা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে লেখা মাঝে-মাঝেই বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।
    প্র: বাংলা উপন্যাসের কোন ঘরানা বা ধারাতে দিব্যেন্দু পালিতকে স্থিত করা যায়?
    উ: ঘরানা নির্দিষ্ট করার কাজ তো সমালোচকের। সাহিত্যিক নিজে আর কী বলবেন এই বিষয়ে!
    প্র: আপনার কি বিশ্বাস- আগামী প্রজন্ম আপনাকে মনে রাখবে, পড়বে?
    উ: সঠিকভাবে বলতে পারব না। তবে আগামী প্রজন্ম হয়তো আমার কোনও কোনও লেখা পড়বে, মনে রাখবে, এমন একটি ধারণা, একটি বিশ্বাস আমার আছে। 

সাম্প্রতিক লেখা সমূহ

প্রবন্ধ

জীবনী

উপন্যাস